Skip to main content

দুষ্টু বাঘ এর গল্প

দুষ্ট বাঘ
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী 

রাজার বাড়ির সিংহ-দরজার পাশে, লোহার খাঁচায় একটা মস্ত বাঘ ছিল। রাজার বাড়ির সামনে দিয়ে যত লোক যাওয়া-আসা করত, বাঘ হাত জোড় করে তাদের সকলকেই বলত, 'একটিবার খাঁচার দরজাটা খুলে দাও না দাদা।' শুনে তারা বলত, 'তা বইকি। দরজাটা খুলে দি, আর তুমি আমাদের ঘাড় ভাঙো।'

এর মধ্যে রাজার বাড়িতে খুব নিমন্ত্রণের ধুম লেগেছে। বড়-বড় পণ্ডিত মশাইয়েরা দলে-দলে নিমন্ত্রণ খেতে আসছেন। তাঁদের মধ্যে একজন ঠাকুর দেখতে ভারি ভালো মানুষের মতো ছিলেন। বাঘ এই ঠাকুরমশাইকে বারবার প্রণাম করতে লাগল।

তা দেখে ঠাকুরমশাই বললেন, 'আহা, বাঘটি তো বড় লক্ষ্মী। তুমি কি চাও বাপু।'

বাঘ হাত জোড় কর বললে, 'আজ্ঞে, একটি বার যদি এই খাঁচার দরজাটা খুলে দেন। আপনার দুটি পায়ে পড়ি।'

ঠাকুরমশাই কিনা বড্ড ভালোমানুষ ছিলেন, তাই তিনি বাঘের কথায় তাড়াতাড়ি খাঁচার দরজা খুলে দিলেন।

তখন হতভাগা বাঘ হাসতে-হাসতে বাইরে এসেই বললে, 'ঠাকুর, তোমাকে তো খাব।'

আর কেউ হলে হয়তো ছুটে পালাত। কিন্তু এই ঠাকুরটি ছুটতে জানতেন না। তিনি ভারি ব্যস্ত হয়ে বললেন, 'এমন কথা তো কখনো শুনিনি। আমি তোমার এত উপকার করলাম আর তুমি বলছ কিনা আমাকে খাবে। এমন কাজটি কি কেউ কখনো করে?'

বাঘ বললে, 'করে বইকি ঠাকুর, সকলেই তা করে থাকে।'

ঠাকুরমশাই বললেন, 'তা কখনোই নয়। চল দেখি তিনজন সাক্ষীকে জিগগেস করি, তারা কি বলে।'

বাঘ বললে, 'আচ্ছা চলুন। আপনি যা বলছেন, সাক্ষীরা যদি তাই বলে, আমি আপনাকে ছেড়ে দিয়ে চলে যাব। আর যদি তারা আমার কথা ঠিক বলে, তবে আপনাকে ধরে খাব।'

সাক্ষী খুঁজতে দুজনে মাঠে গেলেন। দুই ক্ষেতের মাঝখানে খানিকটা মাটি উঁচু রেখে, চাষীরা একটি ছোট পথের মতন করে দেয় তাকে বলে আল। ঠাকুরমশাই সেই আল দেখিয়ে বললেন, 'এই আমার একজন সাক্ষী।'

বাঘ বললে, 'আচ্ছা, ওকে জিগগেস করুন, ও কি বলে।'

ঠাকুরমশাই তখন জিগগেস করলেন, 'ওহে বাপু আল, তুমি বল দেখি আমি যদি কারো ভালো করি, সে কি উল্টে আমার মন্দ করে?'

আল বললে, 'করে বইকি ঠাকুর। এই আমাকে দিয়ে দেখুন না। দুই চাষার ক্ষেতের মাঝখানে আমি থাকি, তাতে তাদের কত উপকার হয়। একজনের জমি আর একজন নিয়ে যেতে পারে না, একজনের ক্ষেতের জল আর একজনের ক্ষেতে চলে যায় না। আমি তাদের এত উপকার করি, তবু হতভাগারা লাঙ্গল দিয়ে আমাকেই কেটে তাদের ক্ষেত বাড়িয়ে নেয়।'

বাঘ বললে, 'শুনলেন তো ঠাকুরমশাই, ভালো করলে তার মন্দ কেউ করে কি না।'

ঠাকুরমশাই বললেন, 'রোসো, আমার আরো দুজন সাক্ষী আছে।'

বাম বললে, 'আচ্ছা চলুন।'

মাঠের মাঝখানে একটা বটগাছ ছিল। ঠাকুরমশাই তাকে দেখিয়ে বললেন, 'ঐ আমার আর একজন সাক্ষী।'

বাঘ বললে, 'আচ্ছা, ওকে জিগগেস করুন। দেখি, ও কি বলে।'

ঠাকুরমশাই বললেন, 'বাপু বটগাছ, তোমার তো অনেক বয়েস হয়েছে, অনেক দেখেছ শুনেছ। বল দেখি, উপকার যে করে তার অপকার কি কেউ করে?'

বটগাছ বললে, 'তাই তো লোক আগে করে। ঐ লোকগুলো আমার ছায়ায় বসে ঠান্ডা হয়েছে, আর আমাকেই খুঁচিয়ে আমার আঠা বার করেছে। আবার সেই আঠা রাখার জন্যে আমারই পাতা ছিঁড়েছে। তারপর ঐ দেখুন, আমার ডালটা ভেঙে নিয়ে চলেছে।'

বাঘ বললে, 'কি ঠাকুরমশাই, ও কি বলছে।'

তখন ঠাকুরমশাই তো মুশকিলে পড়লেন। আর কি বলবেন, ভেবে ঠিক করতে পারলেন না। এমন সময় সেখান দিয়ে একটা শিয়াল যাচ্ছিল। ঠাকুরমশাই সেই শিয়ালকে দেখিয়ে বললেন, 'ঐ আমার আর একজন সাক্ষী। দেখি, ও কি বলে।'

তারপর তিনি শিয়ালকে ডেকে বললেন, 'শিয়ালপণ্ডিত, একটু দাঁড়াও, তুমি আমার সাক্ষী।'

শিয়াল দাঁড়াল, কিন্তু কাছে আসতে রাজী হল না। সে দূর থেকেই জিগগেস করল, 'সে কি কথা।

আমি কি করে আপনার সাক্ষী হলুম?'

ঠাকুরমশাই বললেন, 'বল দেখি বাপু, যে ভালো করে তার মন্দ কে কেউ করে?'

শিয়াল বললে, 'কার কি ভালো কে করেছিল, আর কার কি মন্দ করে করেছে, শুনলে তবে বলতে শারি।'

ঠাকুরমশাই বললেন, 'বাঘ খাঁচার ভিতরে ছিল, আর আমি ব্রাহ্মণ পথ দিয়ে যাচ্ছিলুম-'

এই কথা শুনেই শিয়াল বললে, 'এটা বড় শক্ত কথা হলো। সেই খাঁচা আর সেই পথ না দেখলে, আমি কিছুই বলতে পারব না।'

কাজেই সকলকে আবার সেই খাঁচার কাছে আসতে হলো। শিয়াল অনেকক্ষণ সেই খাঁচার চারধারে

পায়চারি করে বললে, 'আচ্ছা, খাঁচা আর পথ বুঝতে পেরেছি। এখন কি হয়েছে বলুন।' ঠাকুরমশাই বললন, 'বাঘ খাঁচার ভিতরে ছিল, আর আমি ব্রাহ্মণ পথ দিয়ে যাচ্ছিলুম।'

অমনি শিয়াল তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললে, 'দাঁড়ান, অত তাড়াতাড়ি করবেন না, আগে ঐটুকু বেশ করে বুঝে নিই। কি বললেন? বাঘ আপনার বামুন ছিল, আর পথটা খাঁচার ভিতর দিয়ে যাচ্ছিল?'

এই কথা শুনে বাঘ হো-হো করে হেসে বললে, 'দূর গাধা। বাঘ খাঁচার ভিতর ছিল, আর বামুন পথ দিয়ে যাচ্ছিল।'

শিয়াল বললে, 'রোসো দেখি-বামুন খাঁচার ভিতর ছিল, আর বাঘ পথ দিয়ে যাচ্ছিল?'

বাথ বললে, 'আরে বোকা, তা নয়। বাঘ খাঁচার ভিতরে ছিল, বামুন পথ দিয়ে যাচ্ছিল?'

শিয়াল বললে, 'এ তো ভারি গোলমালের কথা হলো দেখছি। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কি

? বাঘ বামুনের ভিতরে ছিল, আর খাঁচা পথ দিয়ে যাচ্ছিল?' বললে

বাঘ বললে, 'এমন বোকা তো আর কোথাও দেখিনি। আরে বাঘ ছিল খাঁচার ভিতরে, আর বামুন

যাচ্ছিল পথ দিয়ে।'

তখন শিয়াল মাথা চুলকাতে-চুলকাতে বললে, 'না। অত শক্ত কথা আমি বুঝতে পারব না।'

ততক্ষণে বাঘ রেগে গিয়েছে।

সে শিয়ালকে এক ধমক দিয়ে বললে, 'ও কথা তোকে বুঝতেই হবে। দেখ, আমি এই খাঁচার ভিতরে ছিলুম-দেখ-এই এমনি করে-

বলতে বলতে বাঘ খাঁচার ভিতরে গিয়ে ঢুকল, আর শিয়ালও অমনি খাঁচার দরজা বন্ধ করে হুড়কো এঁটে দিল। তারপর শিয়াল ঠাকুরমশাইকে বলল, 'ঠাকুরমশাই, এখন আমি সব বুঝতে পেরেছি। আমার সাক্ষী যদি শুনতে চান, তবে তা হচ্ছে এই যে, দুষ্ট লোকের উপকার করতে নেই। কাজেই বাঘ মামার জিত। এখন আপনি শিগগির যান, এখনো ফলার ফুরোয়নি।' বলে শিয়াল বনে চরতে গেল, আর ঠাকুরমশাই ফলার খেতে গেলেন।

Comments

Popular posts from this blog

HSC transformation/changing sentence all board questions

Transformation Worksheet-5.0 1. Read the text and change the sentences as directed: [Dhaka Board-2019] You must have heard the name of Bayazid Bostami. (a) He was one of the greatest saints of Islam. (positive) One night he was learning his lessons. (b) At that time his mother asked him for a glass of water. (passive) (c) There was no drinking water in the house, so he went out to fetch it. (complex) (d) When he came back, he found his mother sleeping. (compound) Then he passed the whole night standing with a glass of water beside his mother. (e) He showed a great love and respect to his mother. (exclamatory) 2. Read the following sentences and change them as directed in the bracket. [Rajshahi Board-2019] (a) Tell me your age. (Complex) (b) Some poets are at least as great as Tennyson. (Superlative) (c) What though the field be lost! (Assertive) (d) My watch was lost. (Active) (e) He confessed that he was guilty. (Simple) 3. Read the text and transform the sentences as dire...

Books poem analysis with bangla

Books poem in bangla and with analysis Verse-wise Bangla Translation: What worlds of wonder are our books! As one opens them and looks, New ideas and people rise In our fancies and our eyes. আমাদের বইগুলো কী আশ্চর্য এক জগৎ! যখনই কেউ তা খুলে দেখে, নতুন ভাবনা আর নতুন মানুষ জেগে ওঠে কল্পনায় ও চোখের সামনে। The room we sit in melts away, And we find ourselves at play With some one who, before the end, May become our chosen friend. আমরা যে ঘরে বসে আছি, তা যেন মিলিয়ে যায়, আর আমরা আবিষ্কার করি নিজেদের খেলায় মত্ত কাউকে সঙ্গে নিয়ে, যে হয়তো শেষ পর্যন্ত আমাদের প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠবে। Or we sail along the page To some other land or age. Here's our body in the chair, But our mind is over there. অথবা আমরা পৃষ্ঠার ওপর দিয়ে ভাসতে থাকি অন্য কোনো দেশ বা কালের দিকে। আমাদের শরীরটা রয়েছে চেয়ারে, কিন্তু মন চলে গেছে দূরে অন্য কোথাও। Each book is a magic box Which with a touch a child unlocks. In between their outside covers Books hold all things for their lovers. প্রতিটি বই একেকটি জাদুর বাক্স, যা শিশুরা এক ...

Rearrange HSC 2025 - All Board Questions

Rearrange HSC 2025 - All Board Questions 1. Rearrange the following sentences to make a coherent order. Dhaka Board-2025 (a) As Saadi was dressed in his usual inexpensive attire, the courtier didn't recognize him. (b) On his way back home from the emperor's palace, Saadi deliberately stopped at the same courtier's house. (c) During the meal, however, the guest began to put the delicacies into the folds of his fine clothes. (d) Sheikh Saadi, a renowned Persian poet, was travelling to the emperor's palace. (e) Saadi said that his clothes, in fact, deserved the food, reminding the host that last time he was shown poor hospitality because of his ordinary clothes. (f) Seeing the expensive clothes of the guest, the courtier and his men were extremely hospitable, offering him a spread of fine dishes. (g) Surprised, the courtier asked, "Why are you feeding your clothes, my honorable guest?" (h) Night fell on the way, and the poet took shelter in a courtier...