সামান্য একটু বৃষ্টি বা জ্যোৎস্না, এক চিমটি মন খারাপ আর এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা
## চায়ের রঙে আঁকা জলছবি##
নদীর নাম চিত্রা। নদীর ঘাটের ঠিক বাঁ দিকে একটা বুড়ো বটগাছ আছে। সেই গাছের নিচে মফিজ মিয়ার চায়ের দোকান। মফিজ মিয়ার চায়ের একটা বিশেষত্ব আছে, সে চায়ে কখনো কনডেন্সড মিল্ক দেয় না। খাঁটি গরুর দুধ জ্বাল দিয়ে লাল করে, সেই দুধে চিনি আর কড়া লিকার দিয়ে যে চা বানায়, তার স্বাদ অমৃত।
তানভীর আর রিনি গত দুই বছর ধরে এই ঘাটে বসে চা খাচ্ছে।
তারা দুজনেই স্থানীয় একটা কলেজের শিক্ষক। তানভীর রসায়নের, রিনি বাংলার। কলেজের ক্লাস শেষ করে প্রতিদিন বিকেলে তারা এখানে আসে। এটা এখন তাদের এক অদ্ভুত অলিখিত নিয়ম। কোনোদিন যদি রিনির আসতে দেরি হয়, তানভীর নদীর দিকে তাকিয়ে একা একা ছটফট করে। আবার কোনোদিন তানভীর কলেজের কাজে আটকে গেলে রিনি মফিজ মিয়ার বেঞ্চিতে বসে উদাস হয়ে শাড়ির আঁচল আঙুলে জড়ায়।
আজ আকাশটা একটু মেঘলা। নদীর পানি কেমন কালো মতন দেখাচ্ছে।
মফিজ মিয়া দুই কাপ ধোঁয়া ওঠা চা দিয়ে গেল। মাটির কাপ। তানভীর কাপে চুমুক দিয়ে বলল, "আজকের চা-টা অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশি ভালো হয়েছে, রিনি।"
রিনি চায়ের কাপে ফুঁ দিয়ে বলল, "আপনি প্রতিদিন এই একই কথা বলেন।"
"প্রতিদিনের চা-ই আমার কাছে স্পেশাল মনে হয়। আসলে চায়ের স্বাদ নির্ভর করে কার সাথে বসে খাচ্ছো, তার ওপর।"
রিনি জবাব দিল না। সে নদীর ওপারে তাকিয়ে রইল। একটা ছোট নৌকা তরতর করে পার হয়ে যাচ্ছে। রিনির চোখের কোণায় এক ফোঁটা আলো এসে পড়েছে। তানভীর মুগ্ধ হয়ে রিনির প্রোফাইল দেখল। কপালে একটা ছোট টিপ, কানে রুপোর দুল।
হঠাৎ রিনি বলল, "তানভীর সাহেব।"
"বলো।"
"আজ আমাদের বাসায় মেহমান আসবে। আপনার ভাবীর খালাতো ভাই। উনি নাকি খুব ভালো রাঁধেন। আজ খাসির মাংস দিয়ে পোলাও রান্না হবে। আপনার ভাবী সকাল থেকে এলাচ-দারুচিনি বাটছেন।"
তানভীর একটু হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না। সে বলল, "ভালোই তো। খাসির মাংসের পোলাও তো তোমার প্রিয়।"
"হুম।" রিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
এই যে দীর্ঘশ্বাস, এর পেছনে একটা মস্ত বড় দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। রিনির একটা নিজস্ব সংসার আছে। স্বামী সাজ্জাদ সাহেব ব্যাংকার, রসকসহীন রাশভারী মানুষ। চায়ের চেয়ে কফি পছন্দ করেন, আর রিনির এই নদীপাড়ে বসে সময় নষ্ট করাটাকে 'বাচ্চপনা' মনে করেন।
আর তানভীরের স্ত্রী নীলা। সুন্দরী, সংসারী মেয়ে। কিন্তু তানভীরের ভেতরের ওই ছটফটে রূপ রসায়নের শিক্ষকটাকে সে কখনো ছুঁতে পারেনি।
দুইজন মানুষ। দুজনেই বিবাহিত। দুজনেরই আলাদা সমাজ, আলাদা সংসার, আলাদা দায়িত্ব। অথচ এই নদীপাড়ের এক কাপ চায়ের দূরত্বে তারা একে অপরের কতটা কাছে, কতটা চেনা!
তানভীর বলল, "রিনি, একটা কথা জিজ্ঞেস করব? সত্যি উত্তর দেবে?"
"জি, বলুন।"
"তুমি কি সুখী?"
রিনি চায়ের কাপটা বেঞ্চের ওপর রাখল। মাটির কাপে সামান্য একটু চা লেগে রইল। সে তানভীরের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে এক সমুদ্র আকুলতা। রিনি মৃদু স্বরে বলল, "সুখ তো আপেক্ষিক জিনিস, তানভীর সাহেব। আমি ভালো আছি। সাজ্জাদ সাহেব মানুষ খারাপ নন।"
"আমি ভালো আছির কথা জিজ্ঞেস করিনি, রিনি। আমি সুখের কথা বলেছি।"
রিনি এবার একটু হাসল। সেই হাসিতে কেমন একটা বিষাদ মাখানো। সে বলল, "প্রতিদিন বিকেল চারটে থেকে পাঁচটা—এই এক ঘণ্টা আমি খুব সুখী থাকি। এই এক ঘণ্টার জন্য আমি বাকি তেইশ ঘণ্টা একটা সাধারণ, দায়িত্বশীল পুতুলের মতো জীবন পার করে দিতে পারি।"
তানভীরের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। সে রিনির একটা হাত ধরতে চাইল, কিন্তু পারল না। এক অদৃশ্য সুতো তাদের বেঁধে রেখেছে, আবার এক অদৃশ্য দেয়াল তাদের আলাদা করে রেখেছে। সমাজ একে বলবে 'পরকীয়া' বা 'পাপ'। কিন্তু তারা তো কেউ কাউকে ছোঁয়নি। তারা শুধু প্রতিদিন বিকেলে এক কাপ চা ভাগ করে নেয়, আর ভাগ করে নেয় নিজেদের নিঃসঙ্গতা।
হঠাৎ টিপটিপ করে বৃষ্টি নামল।
নদীর পানিতে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে চমৎকার একটা শব্দ হচ্ছে। মফিজ মিয়া ডাকল, "স্যার, আপনেরা ঘরের চালাত আইসা বসেন। ভিজা যাইবেন।"
কেউ উঠল না। বৃষ্টিতে রিনির শাড়ি ভিজতে লাগল, তানভীরের চশমার কাচ ঝাপসা হয়ে গেল।
রিনি উঠে দাঁড়াল। বলল, "আজ উঠি। বড্ড দেরি হয়ে গেল।"
তানভীরও উঠল। সে পকেট থেকে টাকা বের করে মফিজ মিয়াকে দিল। তারপর রিনির পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। কেউ কারো হাত ধরল না, কিন্তু দুজনের ছায়া বৃষ্টির পানিতে মিশে এক হয়ে গেল।
রিনি রিকশায় ওঠার আগে ঘুরে তাকাল। তার চোখ দুটো ভেজা, বৃষ্টির জলে নাকি চোখের জলে, চেনা গেল না। সে ফিসফিস করে বলল, "কাল আসবেন তো?"
তানভীর চশমাটা মুছে চোখে দিল। তারপর হেসে বলল, "মফিজ মিয়ার কড়া লিকারের চা না খেলে আমার যে ঘুমই হয় না, রিনি।"
রিকশাটা চলে গেল। তানভীর উল্টো পথে হাঁটতে লাগল। তার পকেটে একটা চাবির রিং, যেটা তার নিজের ফ্ল্যাটের—যেখানে নীলা অপেক্ষা করছে। আর রিনি যাচ্ছে অন্য এক গন্তব্যে।
তারা কেউ কারো হতে পারবে না, এই সত্যটা তারা জানে। কিন্তু আগামীকাল বিকেল চারটেয় আবার চিত্রা নদীর পাড়ে মফিজ মিয়ার দোকানে দুটো মাটির কাপে চা ধোঁয়া ছাড়বে। সেই ধোঁয়ার মাঝেই বেঁচে থাকবে তাদের এক টুকরো নিষিদ্ধ, অথচ পবিত্র প্রেম।
হুমায়ূন আহমেদের হিমু কিংবা মিসির আলি হয়তো এই রহস্যের সমাধান করতে পারত না। কিছু অঙ্কের কোনো উত্তর হয় না। মেলাতে গেলেই শূন্য হাতে ফিরতে হয়।
লেখা: মাস্টারমশাই
Comments
Post a Comment