মানুষের জীবনটা বড় অদ্ভুত। কিছু জীবন তৈরি হয় কেবলই সহ্য করার জন্য, কোনো এক অদৃশ্য খাতায় জমা হওয়া কষ্টের হিসাব মেলানোর জন্য। স্বপ্নীলের জীবনটাও তেমনই একটা পৃষ্ঠা।
বাইরে শ্রাবণের আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে। ট্রেনের জানালার কাচটা ঝাপসা। স্বপ্নীল জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, কিন্তু সে আসলে কিছুই দেখছে না। তার ডান চোখের ঠিক নিচে কালচে একটা দাগ, শাড়ির আঁচলটা টেনে সে সেটা আড়াল করার চেষ্টা করছে। গতকাল রাতেও আনিস তাকে বেল্ট দিয়ে পিটিয়েছে। অপরাধ? তরকারিতে নুন সামান্য কম হয়েছিল।
এই নরক থেকে স্বপ্নীল কোনোদিন বের হতে পারবে না। কারণ তার কোলে ঘুমিয়ে আছে চার বছরের ছোট্ট মেয়েটা—নীলু। ডিভোর্স শব্দটা ভাবলেই সমাজ, পরিবার আর নীলুর ভবিষ্যতের অন্ধকার মুখটা সামনে এসে দাঁড়ায়। তাই স্বপ্নীল মুখ বুজে সব সহ্য করে। আজ তিন বছর পর বাপের বাড়ি যাচ্ছে, তাও আনিসের হাত-পা ধরে তিন দিনের ছুটি পেয়েছে।
"আপনার মেয়েটা কিন্তু দেখতে একদম পরীর মতো হয়েছে।"
হঠাৎ একটা নরম, মিষ্টভাষী কণ্ঠস্বরে স্বপ্নীলের ভাবনার সুতোটা ছিঁড়ে গেল। সে তাকিয়ে দেখল, তার পাশের সিটে এক যুবক বসে আছে। চোখে চশমা, গায়ে সাধারণ একটা হালকা নীল শার্ট, কিন্তু অবয়বের মধ্যে একটা অদ্ভুত মায়া আর ভদ্রতা জড়িয়ে আছে।
স্বপ্নীল মৃদু হাসল, কিছু বলল না।
ছেলেটি আবার বলল, "আমি তানভীর। একটা মফস্বল হাইস্কুলে ইংরেজি পড়াই। ঢাকা যাচ্ছিলাম একটা কাজে।"
ট্রেনের দীর্ঘ জার্নিতে একসময় জড়তা কাটল। তানভীর মানুষ হিসেবে দারুণ চমত্কার। তার গল্প বলার ভঙ্গি, তার পরিমিতিবোধ স্বপ্নীলের ভেতরের জমে থাকা পাথরটাকে আস্তে আস্তে গলাতে শুরু করল। যে মেয়েটা গত চার বছর ধরে শুধু গালিগালাজ আর চিল-চিৎকার শুনে এসেছে, তার কানে তানভীরের সহজ, সুন্দর কথাগুলো যেন বৃষ্টির মতো শোনাল।
কথায় কথায় ফেসবুক আইডি বিনিময় হলো, ফোন নাম্বারও। স্বপ্নীল বুঝতে পারল না, সে কেন এক অচেনা মানুষকে নিজের অবদমিত হাসির ভাগ দিচ্ছে। হয়তো মানুষ যখন খুব একা হয়, তখন একটা খড়কুটো পেলেও আঁকড়ে ধরতে চায়।
বাপের বাড়ি থেকে ফেরার পরও তানভীরের সাথে যোগাযোগ বন্ধ হলো না।
আনিস যখন অফিসে থাকত, কিংবা রাতে যখন স্বপ্নীল মার খেয়ে বাথরুমে ঢুকে ফুঁপিয়ে কাঁদত, তখন তার মুঠোফোনে একটা মেসেজ আসত—*"আজকের আকাশটা দেখেছেন? কী সুন্দর নীল!"* কিংবা *"মন খারাপ করবেন না, মেঘের পরেই রোদ আসে।"*
তানভীর একটা ছোট চাকরি করে, সাধারণ জীবন। কিন্তু তার মনটা ছিল বিশাল। স্বপ্নীল তাকে নিজের কষ্টের কথা কখনো খোলসা করে বলেনি, কিন্তু তানভীর তার নীরবতা পড়তে পারত। তানভীর তাকে শেক্সপিয়রের সনেট বুঝিয়ে বলত, সহজ করে ইংরেজি গ্রামার শেখানোর গল্প করত। স্বপ্নীল আবিষ্কার করল, সে চাতক পাখির মতো তানভীরের মেসেজের জন্য অপেক্ষা করে। এই মায়াটা মারাত্মক। এটা এক ধরনের নিষিদ্ধ ভালোলাগা, আবার বেঁচে থাকার একমাত্র অক্সিজেনও।
একদিন গভীর রাতে আনিস প্রচণ্ড মদ খেয়ে এসে স্বপ্নীলকে চুলে ধরে দেয়ালের সাথে ধাক্কা দিল। স্বপ্নীলের কপাল ফেটে রক্ত পড়তে লাগল। নীলু ভয়ে চাদরের নিচে কাঁপতে কাঁপত প্রস্রাব করে দিল।
পরদিন সকালে স্বপ্নীল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের রক্তাক্ত কপালটা দেখল। তার চোখ দিয়ে জল পড়ছে না, চোখ দুটো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে ফোনটা হাতে নিয়ে তানভীরকে মেসেজ করল, *"আমি আর পারছি না তানভীর। এই নরকে আমি মরে যাব।"*
দশ মিনিটের মধ্যে তানভীরের ফোন এল। তানভীরের গলা কাঁপছিল, "স্বপ্নীল, তুমি নীলুকে নিয়ে চলে এসো। আমার কিচ্ছু নেই, একটা ছোট কোয়ার্টার আর স্কুলের সামান্য বেতন। কিন্তু আমি তোমাকে আর ওই পরীটাকে আমার বুকের ভেতর আগলে রাখব। সারাজীবন।"
স্বপ্নীলের বুকটা হু হু করে উঠল। একজন মানুষ তাকে এতটা ভালোবাসতে পারে? কিন্তু... সমাজ? আনিস তো তাকে সহজে ছাড়বে না। সে যদি নীলুকে কেড়ে নেয়?
গল্পের এই পর্যায়ে এসে হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাসের চরিত্ররা একটু অন্যরকম সিদ্ধান্ত নেয়। তারা সবসময় যুক্তি মেনে চলে না, আবেগের এক চরম মুহূর্তে পৌঁছায়।
স্বপ্নীল সিদ্ধান্ত নিল। সে পালাবে। তানভীরের কাছে চলে যাবে। যেখানে মারধর নেই, আছে শুধু রবীন্দ্রনাথের গান আর শান্ত দুপুর।
পরদিন বিকেলে আনিস যখন বাসায় থাকবে না, স্বপ্নীল একটা ছোট ব্যাগে নীলুর কয়েকটা জামা গুছিয়ে নিল। তানভীর স্টেশনে অপেক্ষা করছে। বিকেল ৪টার ট্রেনে তারা অন্য এক শহরে চলে যাবে।
স্বপ্নীল যখন দরজায় তালা দিতে যাবে, তখন নীলু তার আঁচল টেনে ধরল।
"মা, আমরা কোথায় যাচ্ছি?"
"একটা ভালো জায়গায়, মা।"
"বাবা যাবে না?" নীলুর চোখে এক অদ্ভুত ভয়। সে আনিসকে বাঘের মতো ভয় পায়, আবার দিনশেষে সেই তো বাবা।
ঠিক তখনই দরজায় করাঘাত হলো। স্বপ্নীল চমকে উঠল। দরজা খুলতেই দেখল আনিস দাঁড়িয়ে আছে। তবে আজকের আনিসের চেহারা অন্যরকম। তার চোখ দুটো লাল, হাতে একটা খেলনা পুতুল।
আনিস ধপ করে সোফায় বসে পড়ল। স্বপ্নীলের গোছানো ব্যাগটার দিকে সে তাকালও না। সে দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগল।
"স্বপ্নীল, আমাকে ক্ষমা করে দাও। ডাক্তার বলেছে আমার মাথায় একটা টিউমার হয়েছে... থার্ড স্টেজ। আমি আর বেশিদিন নেই। আমি জানি আমি খুব খারাপ মানুষ, কিন্তু শেষ দিনগুলোয় তোমরা আমাকে ছেড়ে যেও না। আমি মরে গেলে তুমি যেখানে ইচ্ছা চলে যেও..."
একটি নিষ্ঠুর, অত্যাচারী মানুষ যখন হুট করে মরণব্যাধির সামনে দাঁড়িয়ে অসহায় শিশুর মতো কাঁদে, তখন নারীর ভেতরের 'মা' সত্তাটা জেগে ওঠে। স্বপ্নীলের হাতের ব্যাগটা মেঝেতে পড়ে গেল। সে বুঝল, শৃঙ্খলটা ভাঙার চাবি তার হাতে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু সে সেটা ব্যবহার করতে পারবে না। এটাই নিয়তি।
বিকেল ৪টা বেজে ২০ মিনিট। স্টেশন চত্বরে চাতক পাখির মতো দাঁড়িয়ে আছে তানভীর। তার পকেটে নীলুর জন্য একটা ছোট্ট চকোলেট।
তার ফোনটা কেঁপে উঠল। স্বপ্নীলের মেসেজ:
*"তানভীর, ট্রেনে উঠে পড়ো। আমার ট্রেন মিস হয়ে গেছে। আর কোনোদিন হয়তো আমার ট্রেন আসবে না। নীলুকে ইংরেজি শেখানোর খুব শখ ছিল আমার, তুমি দূর থেকেই তার জন্য দোয়া করো। ভালো থেকো, মিষ্টভাষী মানুষ।"*
তানভীর স্টেশনের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ চশমার কাচ ভেদ করে ভিজে উঠল। সে প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের হুইসেল শুনতে পেল।
হুমায়ুন আহমেদের গল্পে কিছু ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না, তারা বেঁচে থাকে ট্রেনের জানালার বাইরে বয়ে যাওয়া বাতাসের মতো, অথবা দূর আকাশের এক টুকরো মেঘের মায়ায়। তানভীর একা একাই ট্রেনে উঠে পড়ল, আর স্বপ্নীল ফিরে গেল তার অন্ধকার চেনা নরকে, যেখানে এখন অত্যাচারী স্বামীর সেবার এক নতুন দায়ভার তার কাঁধে।
কাচের ওপারে বৃষ্টি বাড়ছে। কিছু মায়া চিরকাল অপূর্ণই থেকে যায়।
Comments
Post a Comment