---
## এক
বাড়ির উঠানে একটা কদম গাছ আছে।
কমল প্রতিদিন সকালে উঠে দেখে গাছটার দিকে। বর্ষায় কদম ফোটে, আর কমলের বুকে একটা অদ্ভুত আনন্দ জাগে। এই আনন্দের কোনো কারণ নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই। কমল ব্যাখ্যায় বিশ্বাস করে না। সে বিশ্বাস করে স্বপ্নে।
স্বপ্নটা সহজ।
একটা স্কুল। সবুজ মাঠ। আর সে দাঁড়িয়ে আছে ক্লাসের সামনে। হাতে চক। বোর্ডে লেখা — *"আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।"*
এই স্বপ্নটা কমল দেখে ছোটবেলা থেকে।
---
কমলদের বাড়ি নরসিংদীর এক ছোট্ট গ্রামে। বাবা রহিম মিয়া দিনমজুর। মা রাবেয়া বেগম সংসার সামলান। তিন ভাইবোনের মধ্যে কমল বড়। পরিবারে টাকার অভাব সবসময়। তবু কমল পড়েছে। হারিকেনের আলোয়, বৃষ্টির শব্দের মাঝে, পেটে ক্ষুধা নিয়ে — পড়েছে।
এসএসসি পরীক্ষার মাত্র তিন মাস বাকি।
সেদিন সন্ধ্যায় কমল অঙ্ক করছিল। বাইরে থেকে বাবার গলা শোনা গেল। সঙ্গে আরেকটা গলা — পরিচিত নয়।
মা এসে ঘরে ঢুকলেন। মুখে একটা অদ্ভুত হাসি।
*"কমল, একটু বাইরে আয়।"*
*"পরীক্ষা আছে মা, এখন না।"*
*"আরে আয় বলছি। তোর জন্য সম্মন্ধ এসেছে। ছেলে ঢাকায় কাজ করে। মাসে পাঁচ হাজার টাকা আয়।"*
কমল খাতা বন্ধ করল। ধীরে ধীরে। তারপর মায়ের দিকে তাকাল।
*"মা, আমার পরীক্ষা তিন মাস পরে।"*
*"সে তো দেবেই। বিয়ের পরেও দেওয়া যাবে।"*
*"না মা।"*
রাবেয়া বেগম অবাক হলেন। এই মেয়ে কখনো না বলে না।
*"না মানে?"*
*"না মানে না। আমি বিয়ে করব না। আমি পড়ব। আমি শিক্ষিকা হব।"*
রাত্রে বাবা অনেক বোঝালেন। মা কাঁদলেন। পাশের বাড়ির চাচী বললেন, *"মেয়েমানুষের আবার এত পড়ার কী দরকার!"*
কমল শুনল। সব শুনল। তারপর হারিকেনটা জ্বালিয়ে আবার খাতা খুলল।
বাইরে কদম গাছে একটা পাখি ডাকছে।
---
## দুই
এসএসসিতে কমল জিপিএ-৫ পেল।
সেদিন গ্রামে একটু শোরগোল হলো। রহিম মিয়া গর্বে বুক ফুলিয়ে চায়ের দোকানে বসলেন। রাবেয়া বেগম চোখ মুছলেন। কমল ফলাফলের কাগজটা বুকে চেপে ধরে কদম গাছের নিচে বসে রইল অনেকক্ষণ।
তারপর শুরু হলো আসল যুদ্ধ।
কলেজে পড়তে হলে শহরে যেতে হবে। টাকা নেই। বাবা রাজি নন। মা ভয় পাচ্ছেন। আত্মীয়রা হাসছেন।
কমল থামল না।
এক দূর সম্পর্কের মামা ঢাকায় থাকেন। কমল চিঠি লিখল। মামা পড়লেন। মামি বিরক্ত হলেন। কিন্তু মামার বুকে একটুখানি দয়া ছিল। তিনি রাজি হলেন থাকার ব্যবস্থা করতে। পড়ার খরচ কমলকে নিজেই জোগাড় করতে হবে।
ঢাকায় এসে কমল টিউশনি শুরু করল। সকালে পড়াশোনা, বিকেলে টিউশনি, রাতে আবার পড়া। মামির কথা শুনতে হয়, ছোটখাটো কাজ করতে হয়, মাঝে মাঝে রাতে বালিশ ভেজে। কিন্তু সকালে উঠে আবার শুরু।
এইচএসসিতেও ভালো ফল। তারপর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি।
চার বছর পরে অনার্স। দুই বছর পরে মাস্টার্স।
কমলের বয়স তখন পঁচিশ।
সে শিক্ষিকা হওয়ার স্বপ্নের খুব কাছে এসে গেছে।
---
## তিন
চাকরির বিজ্ঞপ্তিটা পত্রিকায় দেখা গেল একটা বৃষ্টির সকালে।
*"মধুপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বাংলা বিষয়ে একজন শিক্ষক আবশ্যক।"*
কমল আবেদন করল। পরীক্ষা দিল। সাক্ষাৎকার দিল।
নিয়োগপত্র যেদিন হাতে পেল, সেদিন সে একা একা অনেকক্ষণ বসে রইল। কাউকে জানাল না। শুধু মনে মনে বলল — *"হয়ে গেছে।"*
স্কুলটা ছোট। মাঠে ঘাস। পুরনো ভবন। টিনের চাল। বর্ষায় একটু চুঁইয়ে পড়ে।
কমল প্রথমদিন ক্লাসে ঢুকে বোর্ডে লিখল — *"আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।"*
স্বপ্নটা সত্যি হয়েছে।
---
## চার
সুনীল সরকার।
গণিতের শিক্ষক।
বয়স বত্রিশ। মুখে হালকা দাড়ি। চোখে চশমা। কথা বলেন কম। হাসেন আরও কম। কিন্তু যখন হাসেন, তখন মনে হয় হঠাৎ মেঘের ফাঁকে রোদ উঁকি দিল।
কমল প্রথমে খেয়ালই করেনি।
তারপর একদিন টিচার্স রুমে বৃষ্টি নামল হঠাৎ। কমল জানালার পাশে বসে খাতা দেখছিল। সুনীল এসে বললেন, *"চা খাবেন?"*
কমল তাকাল। *"এই বৃষ্টিতে চা পাওয়া যাবে?"*
*"ক্যান্টিনে থাকে। আমি আনতে পারি।"*
*"ধন্যবাদ।"*
দুজনে চা খেলেন। বৃষ্টির শব্দ শুনলেন। কোনো কথা হলো না বিশেষ। কিন্তু সেই নীরবতায় একটা উষ্ণতা ছিল।
কমল সেদিন বাড়ি ফিরে নিজেই অবাক হলো।
সুনীল সরকারের কথা মাথায় আসছে কেন?
---
দিন গেল। সপ্তাহ গেল।
স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে সুনীল একটা কবিতা পড়লেন। জীবনানন্দ দাশের। *"আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে।"*
কমল সেদিন বুঝল।
এই মানুষটাকে সে ভালোবেসে ফেলেছে।
ভালোবাসাটা এসেছে চুপিচুপি। জুতার শব্দ না করে। যেভাবে শরতের কুয়াশা আসে ভোরবেলা।
---
## পাঁচ
সুনীল বিবাহিত।
এটা কমল জানত। স্কুলের সবাই জানে। সুনীলের স্ত্রী মিতা, ছেলে রাহুল — বছর সাত, মেয়ে পিউ — বছর পাঁচ।
কমল নিজেকে বোঝাল। অনেক বোঝাল।
*"এটা ঠিক নয়। এই পথে হাঁটা যাবে না।"*
কিন্তু মন কি কথা শোনে?
সুনীল যখন পাশ দিয়ে হেঁটে যান, কমলের বুকে একটা শব্দ হয়। সুনীল যখন কথা বলেন, কমল শুনতে থাকে — কথাটা নয়, কণ্ঠস্বরটা। সুনীল যখন থাকেন না, স্কুলটা কেমন ফাঁকা লাগে।
একদিন কমল নিজেই বলে ফেলল।
সন্ধ্যা নামছিল। সবাই চলে গেছে। শুধু দুজন রয়ে গেছেন পরীক্ষার রুটিন তৈরি করতে।
*"সুনীল স্যার, একটা কথা বলব?"*
সুনীল চশমার ফাঁকে তাকালেন। *"বলুন।"*
কমল বলল। সরাসরি। ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে নয়।
সুনীল অনেকক্ষণ চুপ রইলেন। জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন, *"আমি বিবাহিত মানুষ, কমল।"*
*"জানি।"*
*"আমার সংসার আছে।"*
*"জানি।"*
*"তাহলে?"*
কমল উত্তর দিল না।
সুনীলও আর কিছু বললেন না।
দুজনে চলে গেলেন যার যার পথে।
---
## ছয়
জীবন চলতে থাকল।
কমল পড়াল। ছাত্রছাত্রীরা তাকে ভালোবাসল। সে ক্লাসে ঢুকলে একটা আলো আসত মনে হতো। বাংলা সাহিত্যকে সে গল্পের মতো করে পড়াত। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ — তার মুখে এদের কবিতা যেন জীবন পেত।
বাইরে থেকে কমলকে দেখলে মনে হতো সুখী মানুষ।
ভেতরে একটা চাপা ব্যথা ছিল। সবসময়।
সুনীলের সঙ্গে কথা হতো। স্বাভাবিকভাবেই। স্কুলের কাজে, পথে, অনুষ্ঠানে। কোনোদিন সে বিষয়টা আর তোলা হলো না। কিন্তু দুজনেই জানত, কথাটা বাতাসে ভাসছে।
বছর গেল।
কমলের জন্য আবার সম্মন্ধ এলো। মা ফোন করলেন।
*"কমল, এবার রাজি হ।"*
*"না মা।"*
*"কেন না? কাউকে ভালোবাসিস নাকি?"*
কমল চুপ রইল।
*"সে কি তোকে ভালোবাসে?"*
কমল আস্তে বলল, *"সে বিবাহিত, মা।"*
ফোনে অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না। তারপর মা বললেন, *"পাগল মেয়ে।"*
*"হ্যাঁ মা, আমি পাগল।"*
---
## সাত
বছরের পর বছর কাটল।
কমলের বয়স তিরিশ হলো। পঁয়ত্রিশ হলো। চল্লিশ ছুঁই ছুঁই।
চুলে দু-একটা পাক ধরল। মুখে হালকা রেখা। কিন্তু চোখের আলো একই রইল।
সুনীলের ছেলে রাহুল বড় হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল। মেয়ে পিউর বিয়ে হলো। সুনীলের চুলও পাকল। চশমার নম্বর বাড়ল।
সুনীলের স্ত্রী মিতা দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। কিডনির সমস্যা। চিকিৎসা চলছিল। সুনীল স্ত্রীর পাশে ছিলেন। সংসার আঁকড়ে ছিলেন।
কমল এসব দেখেছে। কখনো কোনো অভিযোগ করেনি।
সে শুধু অপেক্ষা করেছে।
অপেক্ষাটা কষ্টের ছিল। কিন্তু সে অপেক্ষাটাকে ঘৃণা করেনি। কারণ এই অপেক্ষার মাঝেও সে বেঁচেছিল পুরোপুরি। তার ছাত্রছাত্রীরা ছিল। বই ছিল। কদম গাছটা প্রতি বর্ষায় ফুল দিত।
জীবন ছিল।
---
একবার একটা ঘটনা হলো।
বার্ষিক পরীক্ষার পর স্কুল বন্ধ। কমল একা বসে বইয়ের তাক গুছাচ্ছিল। সুনীল এলেন।
*"কমল।"*
সে তাকাল।
সুনীল বললেন, *"তুমি কেন এখনো বিয়ে করনি?"*
কমল হাসল। *"কেন করব?"*
*"সংসার হবে। সঙ্গী পাবে।"*
*"সংসার না হলেই কি জীবন থামে?"*
সুনীল চুপ করে গেলেন।
কমল বলল, *"আপনি জানেন আমি কেন করিনি।"*
*"কমল, আমি—"*
*"আপনাকে কিছু বলতে হবে না। আপনি আপনার মতো থাকুন। আমি আমার মতো আছি।"*
সুনীল চলে গেলেন।
টিচার্স রুমে একটা পুরনো ক্যালেন্ডার ছিল দেওয়ালে। সেখানে লেখা — *"সময় সব ক্ষত সারিয়ে দেয়।"*
কমল পড়ল। মনে মনে বলল — *সব না। কিছু ক্ষত রয়েই যায়। সেটাই তো বেঁচে থাকার প্রমাণ।*
---
## আট
মিতা মারা গেলেন।
বছর তিনেক আগে থেকেই শরীর ভেঙে পড়ছিল। এক ভোরবেলায় সব শেষ হলো।
স্কুলে সবাই শুনল। কমলও শুনল।
সেদিন সে একা মাঠে বসে রইল অনেকক্ষণ। কোনো আনন্দ নেই মনে। কোনো প্রত্যাশা নেই। শুধু একটা ভারী চুপচাপ ছিল।
সুনীল অনেকদিন স্কুলে আসলেন না।
যখন ফিরলেন, চোখ বসে গেছে। মুখে বয়স এসে গেছে আরও। কিন্তু তাতে তাকে কেমন যেন আরও সত্যিকার দেখাচ্ছিল।
কমল একদিন বলল, *"খাচ্ছেন ঠিকমতো?"*
সুনীল তাকালেন। *"হ্যাঁ।"*
*"মিথ্যে বলছেন।"*
সুনীল হাসলেন। এতদিন পর।
সেই হাসিতে মেঘের ফাঁকে রোদ ছিল। আগের মতোই।
---
## নয়
দুই বছর গেল।
একদিন বিকেলে সুনীল কমলের কাছে এলেন।
বাইরে শীতের নরম রোদ। গাঁদা ফুল ফুটেছে স্কুলের বাগানে।
সুনীল বললেন, *"কমল, একটা কথা বলব?"*
কমল বই থেকে মুখ তুলল। *"বলুন।"*
*"তুমি কি এখনো—"* সুনীল থামলেন। শুরু করলেন আবার। *"আমি জানি আমার কোনো অধিকার নেই। অনেক দেরি হয়ে গেছে। তোমার জীবনের অনেকটা সময়—"*
*"থামুন।"*
সুনীল থামলেন।
কমল বলল, *"দেরি কোথায়? জীবন তো এখনো আছে।"*
সুনীলের চোখ চিকচিক করল।
কমল আস্তে হাসল। *"চা খাবেন?"*
*"খাব।"*
*"ক্যান্টিনে থাকে। আপনি আনতে পারেন।"*
সুনীল হাসলেন। সেই পুরনো হাসি। প্রথম বৃষ্টির দিনের মতো।
---
## দশ
বিয়েটা হলো শীতের এক সকালে।
খুব ছোট অনুষ্ঠান। কমল চেয়েছিল এভাবেই। স্কুলের কয়েকজন সহকর্মী, মা, এক-দুজন আত্মীয়।
কমলের বয়স তখন পঁয়তাল্লিশ। সুনীলের বাহান্ন।
মা কাঁদলেন। কমল মাকে জড়িয়ে ধরল।
*"কাঁদছ কেন মা?"*
*"এত দেরি হয়ে গেল।"*
*"দেরি হয়নি মা। ঠিক সময়ে হয়েছে। আমার সময়ে।"*
---
বিয়ের রাতে কমল জানালার পাশে বসে ছিল।
জানালার বাইরে শীতের আকাশ। তারা ফুটেছে অজস্র।
সুনীল পাশে এলেন। দুজনে চুপ করে বসে রইলেন।
তারপর সুনীল বললেন, *"কমল, তুমি এতদিন অপেক্ষা করলে কেন?"*
কমল ভাবল। অনেকক্ষণ ভাবল।
তারপর বলল, *"কারণ, কদম গাছে প্রতি বছর ফুল ফোটে। বর্ষার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু ফুল ঠিকই ফোটে।"*
সুনীল কমলের হাত ধরলেন।
কমল চোখ বন্ধ করল।
অনেক বছরের ভার বুকের ভেতর থেকে নেমে গেল নিমেষে।
বাইরে শীতের রাত। কিন্তু ভেতরে — অনেকদিন পর — ভীষণ উষ্ণ।
---
## এগারো
পরের বছর বর্ষায়।
কমল স্কুলে ক্লাস নিচ্ছে। জানালার বাইরে বৃষ্টি। বোর্ডে সে লিখল —
*"আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে — এই বাংলায়।"*
পেছনের বেঞ্চ থেকে একটা মেয়ে হাত তুলল।
*"ম্যাডাম, কবিতাটার মানে কী?"*
কমল হাসল। সেই হাসিতে পঁচিশ বছরের গল্প ছিল।
*"মানে হলো — যাকে ভালোবাসো, তার কাছে ফেরার ইচ্ছে কখনো মরে না।"*
মেয়েটা মাথা নাড়ল।
বুঝল কিনা জানা গেল না।
তবে কমল বুঝল।
সে সবসময় বুঝত।
---
*স্কুলের মাঠে সেদিন বৃষ্টি পড়ছিল। টিনের চালে ঝমঝম শব্দ। আর কমল — মাধ্যমিক স্কুলের বাংলার শিক্ষিকা কমল সরকার — দাঁড়িয়ে আছেন ক্লাসের সামনে। হাতে চক। বুকে একটা পুরনো স্বপ্ন, যেটা সত্যি হয়েছে। আর ঘরে অপেক্ষা করছেন একজন মানুষ — যার জন্য অপেক্ষা করা ছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন, আবার সবচেয়ে সুন্দর কাজ।*
---
**সমাপ্ত**
.
লেখায়- মাস্টারমশাই
Comments
Post a Comment