স্বপ্নীল চক্রবর্ত্তীর কয়েকটি কবিতা
আমার শোকসভায় সভাপতিত্ব করুক কোনো বিপত্নীক একলা চড়ুই;
চড়ুই এর চাইতে আর বেশী কেইবা জানে,ঘর ভেঙে যাওয়ার দুঃখ।
আমার শোকশভায় দীর্ঘশ্বাস ফেলুক শতাব্দীর সবচাইতে প্রাচীণ অশ্বথ,
সেই দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে যাক আমার প্রেমিকার উঠোনে,অন্তত একটা দ্বিপ্রহর তার মন খারাপ থাকুক৷
আমার শোকসভায় সমাপনী বক্তব্য পেশ করতে দেওয়া হোক আমার সবচাইতে কাছের শত্রুটিকে,
অকপটে সে বলে ফেলুক আমি কতটা উন্মাদ ছিলাম।
আমার শোকসভায় কান্নার আওয়াজ তুলুক আমার এলাকার বৃদ্ধ কুকুর টা,
ওর কান্নায় অন্তত কোনো ভান থাকবেনা।
আমার শোকসভা কোনো ডাস্টবিনের পাশে হোক,
ছড়িয়ে যাক দুর্গন্ধ,সভ্য মানুষেরা অজুহাত দেখিয়ে চলে যাক সভা শেষ হওয়ার আগেই।
আমার শোকসভায় বৃষ্টি হোক;
বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে সভা পন্ড হয়ে গেলেও এককোণায় বসে থাকুক একটা শহুরে কাক;
যদি এক টুকরো মাংস অন্তত জোটে।
শোকসভা
©স্বপ্নীল চক্রবর্ত্তী
এই শহরে আমি অভাব বলতে যা বুঝি
আমি তাদের নাম দিয়েছি ভালোবাসা;
এই শহরে আমি ঘৃণা বলতে যা বুঝি
আমি তাদের নাম রেখেছি সম্পত্তি,মালিকানা।
এই শহরে যা কিছু অভ্যেস,যা কিছু ভাবায় খুব;
তাদের আমি স্মৃতি বলি।
এই শহরে যারা বুঝেও না বোঝার ভান করে নিজের বোঝা চাপিয়ে দেয় অন্যের ঘাড়ে,
তাদের আমি গনতন্ত্র বলি।
এই শহর যখন জল থৈ থৈ,বজ্রপাতে কান ঢাকা দায়,
তখন জলের মানে মিছিল বুঝি,বজ্রপাত কে শ্লোগান ভাবি।
এই শহরে, একমুঠো ভাতের জন্য যারা মরে যায়
তাদের আমি শহীদ বলি।
নামকরণ
©স্বপ্নীল চক্রবর্ত্তী
আমার বুকের ভেতরবাড়িটা মর্গের মতো শীতল;
চারটে লাশ শুয়ে আছে ওখানে,সবগুলোই আমার।
আমি প্রথমবার মারা গিয়েছিলাম অবহেলায়,
দ্বিতীয়বার মরেছিলাম প্রতিশ্রুতির অকালমৃত্যুতে,
তৃতীয়বার আমাকে খুন করেছিলো একজন বিশ্বাসঘাতক ;
চতুর্থবার মরেছি স্বেচ্ছায়।
আমার বুকের ভেতরবাড়িটা মর্গের মতো শীতল,
ওখানে চারটে লাশ;
ওদের ময়নাতদন্ত হয়নি।
ভেতরবাড়ির মর্গ
©স্বপ্নীল চক্রবর্ত্তী
একদিন সকাল হবে;
দু নলা গরম ভাত খাইয়ে দিয়ে মা তাড়া দেবে;
“স্কুলের দেরী হয়ে যাবে খোকা”।
একদিন সকাল হবে
জুঁইফুলের ঘ্রাণ মেখে অবন্তী কলেজে আসবে,
আমি ফের হাঁটু গেড়ে বসে বলে দেবো,এই শেষবার, ভালোবাসি বলো,নাহলে সত্যি বলছি নির্বাসনে যাবো।
একদিন সকাল হবে;
ক্যাফেটেরিয়াতে বয়ে যাবে তর্কের ঝড়,
ক্যান্টিনে শিঙাড়ার সাথে পেঁয়াজ দেওয়া হচ্ছেনা বলে অনশনে বসবে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়।
একদিন সকাল হবে;
অফিসের বস কে জ্বরের অজুহাত দেখিয়ে চলে যাবো সমুদ্রে;
আহা সমুদ্র,তুমি কী আমার বউয়ের চাইতেও বেশী রহস্য ধরে রাখো?
একদিন সকাল হবে,
নাতিকে সাথে নিয়ে মর্নিংওয়াকে বের হবো,
নাতনীর হাতে বানানো পায়েসে খুঁজবো পুরোনো কোনো স্মৃতি।
একদিন সকাল হবে,
যাবতীয় রোগ শোক ভুলে যাবো বেমালুম,
নিয়মের ব্যকরণ কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রমাণ করে দেবো;
মানুষ ও পাখি হতে পারে।
একদিন সকাল হবে
©স্বপ্নীল চক্রবর্ত্তী
আমাদের যেদিন শেষবারের মতো দেখা হলো,
সেদিন বুঝেছিলাম দীর্ঘশ্বাসের চেয়ে ভারী কিছু এই পৃথিবীতে নেই;
আমাদের যেদিন শেষবার কথা হয়,
সেদিন বুঝেছিলাম চুপ করে থাকা কতোটা কষ্টের।
শেষবার যেদিন দুজন দুজনকে ছুঁয়েছিলাম,
সেদিন বুঝেছিলাম আগুন কতোটা পোড়ায়;
শেষবার যেদিন দুজন মুখ ফিরিয়ে চলে গিয়েছিলাম,
সেদিন বুঝেছিলাম প্রস্থান কতোটা কঠিন।
–শেষবার
©স্বপ্নীল চক্রবর্ত্তী
Comments
Post a Comment