মানুষ জন্মায় একা, মরেও একা। কিন্তু মানুষের পুরো জীবনটা কাটে একটা জিনিসের পেছনে দৌড়ে—পরিবার, ভালোবাসা, সম্পর্ক।
তবুও মাঝেমধ্যে আমরা এমন কিছু খবর পাই, যা বুকের মধ্যে একটা অদ্ভুত ভয় ঢুকিয়ে দেয়। একজন বৃদ্ধ মানুষ বাসায় একা থাকতেন। কয়েকদিন দরজা খোলেননি, কেউ খোঁজও নেয়নি। পরে জানা গেল, ক'দিন আগেই মারা গেছেন।
এখানে সবচেয়ে অস্বস্তিকর ব্যাপারটা মৃত্যু না, সবচেয়ে অস্বস্তিকর ব্যাপার হলো তিনি একা ছিলেন। এতটাই একা যে তার অনুপস্থিতিটাও কয়েকদিন কেউ বুঝতে পারেনি।
এই ধরনের খবর দেখলে আমরা খুব দ্রুত একটা পক্ষ বেছে নিই। কেউ বলে "সন্তানেরা অকৃতজ্ঞ", আবার কেউ বলে "শুধু সন্তানদের শূলে চড়ানো ঠিক না"। কিন্তু হয়তো আসল প্রশ্নটা অন্য কোথাও। প্রশ্নটা হলো—কীভাবে একজন মানুষ জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে এত নিঃসঙ্গ হয়ে যায়?
কারণ নিঃসঙ্গতা আর একা থাকা এক জিনিস না। একজন মানুষ একা থেকেও সুখী হতে পারে, কিন্তু নিঃসঙ্গতা হচ্ছে—যখন আপনার জীবনে মানুষ আছে, কিন্তু কানেকশন নেই। ফোন আছে, কিন্তু কথা নেই। পরিবার আছে, কিন্তু উপস্থিতি নেই।
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা—প্রায় ৮৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে মানুষের জীবন পর্যবেক্ষণ করেছে। তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফাইন্ডিংস কি ছিল জানেন? মানুষের দীর্ঘায়ু, সুখ এবং মানসিক সুস্থতা কোনোটাই অর্থ, খ্যাতি বা পেশাগত সাফল্য থেকে আসে না, আসে ভালো সম্পর্ক থেকে। Good relationships keep us healthier and happier.
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, আমরা বাড়ি, গাড়ি, জমিজমার জন্য পরিকল্পনা করলেও জীবনের শেষ বয়সের সময়ের সম্পর্কের জন্য খুব কম মানুষই চিন্তা করে। আমরা ধরে নিই—সন্তান বড় হবে, ভালো চাকরি করবে আর স্বাভাবিকভাবেই আমাদের পাশে থাকবে। কিন্তু তা কি সবসময় হয়?
আমরা যতই বলি, ভালোবাসা কখনো অটোমেটিক্যালি তৈরি হয় না, এটা উত্তরাধিকারসূত্রেও পাওয়া যায় না। ভালোবাসা, ফ্যামিলি ভ্যালুস—এগুলো শেখানো লাগে, অনুভব করানো লাগে। আর শিশুরা শেখে পরিবারের বড়দের দেখে দেখে; বড়রা বড়দের সাথে কেমন আচরণ করে, সেটা দেখে শেখে। মনোবিজ্ঞানীরা এটাকে বলেন Modeling Behavior।
সমস্যা হচ্ছে, একটা শিশু যদি পারিবারিক মূল্যবোধ ছাড়া বড় হয়, তাহলে বাবা-মা তাদের সন্তানের জন্য যদি সর্বস্ব বিলিয়েও দেন, it doesn't matter। কারণ সে বড় হয়ে হয়তো সফল হবে ঠিকই, কিন্তু মানুষ হবে কিনা তা বোঝা বড় দায়।
এজন্যই শুধু সন্তানের উপর নয়, নিজের ভবিষ্যতের উপরও বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। কারণ কোনো মানুষই অন্য একটা মানুষের পুরো পৃথিবী হওয়ার জন্য তৈরি না।
হয়তো এ কারণেই সুস্থ বার্ধক্যের সবচেয়ে বড় উপাদান শুধু অর্থনৈতিক নিরাপত্তা না, সামাজিক নিরাপত্তাও—বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা, কমিউনিটি, কথা বলার মানুষ, খোঁজ নেওয়ার মানুষ। সবমিলিয়ে নিজস্ব একটা জীবন, নিজের কিছু শখ, নিজের পরিচয়।
হয়তো এই কারণেই আমাদের সাফল্যের সংজ্ঞাটা আজ নতুন করে ভাবা দরকার। কারণ যদি জীবনের শেষে আমাদের পরিচয় হয় একজন সফল কর্মকর্তা, একজন সফল ব্যবসায়ী, একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষ—কিন্তু একই সাথে একজন ভীষণ নিঃসঙ্গ মানুষ, তাহলে কোথাও হয়তো একটা হিসাব ভুল হয়ে গেছে।
মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় মৃত্যু না, মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় হলো—মৃত্যুর আগে unwanted হয়ে যাওয়া। আর পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখজনক মৃত্যু হলো—মানুষে ভরা একটা জীবন কাটিয়ে, শেষ সময়ে একা হয়ে যাওয়া।
Comments
Post a Comment