বিদ্রোহী কবিতায় ব্যবহৃত বিভিন্ন পৌরানিক রূপকসমুহের ব্যাখ্যা
মুজফ্ফর আহমদের স্মৃতিকথা অনুযায়ী, ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের এক রাতে কলকাতার ৩/৪-সি তালতলা লেনে বসে নজরুল “বিদ্রোহী” কবিতাটি লিখেছিলেন। তাঁর ভাবনার গতি এত দ্রুত ছিল যে কলমে কালি ডোবানোর সময় বাঁচাতে তিনি পেন্সিল দিয়ে এই কবিতা লিখেছিলেন। পরদিন সকালে মুজফ্ফর আহমদকে কবিতাটি পড়ে শোনান।
বচনে, চয়নে আর বক্তব্যে অসাধারন এক কবিতা!
অনেকেই বলেন ওয়াল্ট হুইটম্যানের 'সং অফ মাইসেলফ' কবিতা থেকেই নাকি তিনি এই কবিতা লেখার অনুপ্রেরনা পেয়েছিলেন; সৈয়দ আলী আহসানসহ কয়েকজন সমালোচক এমন দাবী করেছেন। যদিও আমি অবশ্য এমন কোনো ডেফিনিটিভ প্রাইমারি এভিডেন্স খুঁজে পাইনি।
অনেকে আবার মনে করেন ১ম বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশ-ইন্ডিয়ান আর্মির ৪৯ বেঙ্গলি রেজিমেন্টের কোয়ার্টারমাস্টার হাবিলদার হিসেবে চাকুরীর সুবাদে দেশি বিদেশি সৈন্যদের সাথে মেলামেশার প্রেক্ষিতেই গ্রীক আর ইন্ডিয়ান মিথের প্রতি তার এই গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে। বস্তুতঃ নজরুল ১৯১৭ এর শেষ দিকে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন এবং ১৯২০ এর মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত করাচি সেনাবাহিনীতে ছিলেন। সেখানে থাকাকালে তিনি ফার্সি ভাষাও শিখেছিলেন। ‘বিদ্রোহী’-তে ভারতীয়, ইসলামী ও গ্রিক পুরাণের পাশাপাশি ইতিহাস ও আধুনিক যুদ্ধ-প্রযুক্তির যে বিস্ময়কর সংমিশ্রণ দেখা যায়, তার পেছনে এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার ভূমিকা ছিল বলে অনুমেয়।
এই কবিতার ছত্রে ছত্রে পৌরাণিক রূপকের ব্যবহার এতটাই বিস্ময়কর যে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। শুধু ভারতীয় পুরাণ নয়—‘বিদ্রোহী’-তে বৈদিক ও পৌরাণিক ভারত, ইসলামি ঐতিহ্য, গ্রিক পুরাণ, মধ্য এশিয়ার ইতিহাস, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত এমনকি আধুনিক যুদ্ধ-প্রযুক্তিও পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়েছে।
আরও বিস্ময়কর হলো, নজরুল শুধু এসব নাম ব্যবহার করেননি; প্রতিটি চরিত্র, প্রতিটি প্রতীক এবং প্রতিটি পৌরাণিক শক্তিকে তিনি নিজের ‘আমি’-এর অংশ করে নিয়েছেন।
তাই ‘বিদ্রোহী’ পড়তে গেলে শুধু কবিতার শব্দের সৌন্দর্য উপভোগ করলেই হবে না। জানতে হবে—রুদ্র কে? নটরাজ কেন ধ্বংসের প্রতীক? ভীমের সঙ্গে ‘ভাসমান মাইন’-এর সম্পর্ক কোথায়? ইস্রাফিলের শিঙ্গা কেন? অর্ফিয়াসের বাঁশরীই বা কেন? আর সবশেষে ভৃগু হয়ে ভগবানের বুকে পদচিহ্ন আঁকার অর্থই বা কী?
অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ব্যবহৃত এসব নাম, রূপক, উপমা ও পৌরাণিক ইঙ্গিতের নেপথ্যের গল্প নিয়ে লিখব। সেই সূত্রেই এই প্রয়াস।
এখানে কবিতাটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পংক্তি ধরে এগোব। যেখানে পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক কোনো চরিত্র এসেছে, সেখানে প্রথমে জানব তিনি বা সেটি কে; তারপর জানব তাঁর কাহিনি; এবং সবশেষে বোঝার চেষ্টা করব—নজরুল কেন সেই চরিত্র বা প্রতীকটিকে ঠিক ওই জায়গায় ব্যবহার করেছেন।
চলুন তাহলে শুরু করা যাকঃ
বল বীর-বল উন্নত মম শির!
শির নেহারী' আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রীর!
(‘হিমাদ্রী’ শব্দটি এসেছে ‘হিম’ অর্থাৎ বরফ এবং ‘অদ্রি’ অর্থাৎ পর্বত থেকে। হিমাদ্রী বলতে হিমালয় পর্বতমালাকে বোঝানো হয়। নজরুল এখানে নিজের মাথাকে এতটাই উঁচু করে তুলেছেন যে হিমালয়ের সর্বোচ্চ শিখরও যেন তাঁর মাথার দিকে তাকিয়ে মাথা নত করছে। অর্থাৎ শুরুতেই কবি তাঁর বিদ্রোহী সত্তার আত্মমর্যাদা ও অপরাজেয় উচ্চতাকে প্রতিষ্ঠা করছেন।)
বল বীর-বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি
চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি
ভূলোক দ্যূলোক গোলোক ভেদিয়া
খোদার আসন আরশ ছেদিয়া,
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর!
মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
(‘ভূলোক’ বলতে সাধারণভাবে পৃথিবী বা মর্ত্যলোক বোঝায়। ‘দ্যুলোক’ হলো স্বর্গ বা দেবলোক। আর ‘গোলোক’ বৈষ্ণব ঐতিহ্যে শ্রীকৃষ্ণের পরম আবাস বা ধাম হিসেবে পরিচিত। বৈষ্ণব দর্শনে গোলোককে বৈকুণ্ঠেরও ঊর্ধ্বে কৃষ্ণের নিত্যধাম হিসেবে বিবেচনা করা হয়; বৃন্দাবনকে অনেক বৈষ্ণব ঐতিহ্যে গোলোকের মর্ত্য প্রকাশ বা প্রতিরূপ হিসেবে দেখা হয়।
এরপর নজরুল বলছেন, তাঁর বিদ্রোহী সত্তা শুধু পৃথিবী, স্বর্গ কিংবা কৃষ্ণের ধামই নয়—‘খোদার আসন আরশ’ও ভেদ করে উঠে গেছে। এখানে হিন্দু ও ইসলামি ধর্মীয় প্রতীক পাশাপাশি এসেছে। ‘আরশ’ ইসলামি ঐতিহ্যে আল্লাহর মহান আরশ বা Throne of God-কে বোঝায়।
অর্থাৎ কবির ‘আমি’ কোনো একটি জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবী থেকে স্বর্গ, গোলোক থেকে আরশ—সমস্ত মহাজাগতিক স্তর অতিক্রম করে সে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করছে।
এরপর আসে ‘রুদ্র’।
রুদ্র বৈদিক ঐতিহ্যের এক ভয়ংকর ও শক্তিশালী দেবতা। তিনি ঝড়, প্রকৃতির প্রচণ্ডতা, ভয়, রোগব্যাধি ও ধ্বংসের সঙ্গে যুক্ত। পরবর্তী হিন্দু ঐতিহ্যে রুদ্র শিবের সঙ্গে গভীরভাবে একীভূত হয়ে যান। তবে রুদ্রকে সরাসরি গ্রিক পুরাণের ‘থর’ বা বজ্রদেবতার সমতুল্য বলা ঠিক নয়। রুদ্রের সঙ্গে ঝড় ও ধ্বংসের সম্পর্ক থাকলেও তিনি Thor-এর ভারতীয় সংস্করণ নন।
‘মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে’—এই পংক্তিতে নজরুল নিজের কপালকে রুদ্রের শক্তির আসন হিসেবে কল্পনা করেছেন। কপাল এখানে শুধু শরীরের অঙ্গ নয়; এটি শক্তি, অহংকার, মর্যাদা ও মহাজাগতিক ক্ষমতার প্রতীক।)
বল বীর-আমি চির-উন্নত শির!
আমি চিরদুর্দম, দূর্বিনীত, নৃশংস,
মহাপ্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!
আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর,আমি দূর্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
(‘নটরাজ’ শিবের একটি বিখ্যাত রূপ। ‘নট’ অর্থ অভিনেতা বা নর্তক এবং ‘রাজ’ অর্থ রাজা—অর্থাৎ নটরাজ, নৃত্যের রাজা। শিবের নটরাজ রূপে তাঁর তাণ্ডব নৃত্য সৃষ্টির, স্থিতির এবং বিশেষত সংহারের মহাজাগতিক শক্তির প্রতীক।
পুরাণীয় ঐতিহ্যে শিবের তাণ্ডবের বিভিন্ন কাহিনি রয়েছে। তবে গজাসুর বা কালাসুরকে বধ করার পর তাণ্ডব নৃত্যই নটরাজ নামের একমাত্র উৎস—এভাবে বলা ঠিক নয়। নটরাজ মূলত শিবের মহাজাগতিক নৃত্যরূপের প্রতীক।
নজরুলের ‘মহাপ্রলয়ের আমি নটরাজ’ তাই খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি নিজেকে এমন এক শক্তি হিসেবে কল্পনা করছেন, যার মধ্যে মহাপ্রলয়ের মতো ধ্বংসক্ষমতা রয়েছে।
এরপর ‘পৃথ্বী’। এখানে ‘পৃথ্বী’ বলতে পৃথিবীকে বোঝানো হয়েছে। তবে এর সঙ্গে রাজা পৃথুর পৌরাণিক কাহিনির সম্পর্ক নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়। পৃথু ছিলেন রাজা বেণের পুত্র এবং পুরাণীয় কাহিনি অনুযায়ী তিনি পৃথিবীকে বশে এনে প্রজাদের জন্য খাদ্য ও সম্পদের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু নজরুলের এই পংক্তিতে ‘পৃথ্বীর’ অর্থ সরাসরি পৃথিবীর। অর্থাৎ তিনি নিজেকে পৃথিবীর জন্য ‘অভিশাপ’ বা ভয়ংকর শক্তি হিসেবে ঘোষণা করছেন।)
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!
আমি মানি না কো কোন আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!
আমি ধূর্জটী, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর
আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাতৃর!
বল বীর-চির-উন্নত মম শির!
(এখানে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পৌরাণিক চরিত্র ‘ভীম’।
ভীম মহাভারতের পাঁচ পাণ্ডবের দ্বিতীয় ভাই। কুন্তী বায়ুদেবের আশীর্বাদে তাঁকে লাভ করেছিলেন বলে মহাভারতে বর্ণিত। অসাধারণ শারীরিক শক্তি, ক্ষুধা, সাহস ও যুদ্ধক্ষমতার জন্য ভীম ছিলেন পাণ্ডবদের প্রধান শক্তিগুলোর একটি।
শৈশবে দুর্যোধন ভীমকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে তাঁর খাবারে বিষ মিশিয়ে দেন এবং অচেতন ভীমকে জলে ফেলে দেন। পরবর্তী কাহিনিতে ভীম নাগলোকের সংস্পর্শে এসে বিষের প্রভাব কাটিয়ে শক্তি ফিরে পান এবং আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন।
নজরুল বলেন—‘আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!’
টর্পেডো ও ভাসমান মাইন আধুনিক যুদ্ধের বিধ্বংসী অস্ত্র। আর ভীম প্রাচীন ভারতীয় মহাকাব্যের অপ্রতিরোধ্য শক্তির প্রতীক। অর্থাৎ নজরুল একই নিঃশ্বাসে প্রাচীন পৌরাণিক শক্তি এবং আধুনিক সামরিক প্রযুক্তিকে একত্র করেছেন।
‘ভীম ভাসমান মাইন’কে ভীমের বিষপানের কাহিনির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা যায়—এমন প্রমাণ নেই। তবে ভীমের ভয়ংকর শক্তি ও মাইন-এর আকস্মিক বিধ্বংসী আঘাত—এই দুইয়ের মধ্যে একটি শক্তিশালী কাব্যিক সাদৃশ্য রয়েছে।
এরপর ‘ধূর্জটী’।
ধূর্জটী শিবের একটি নাম। তাঁর জটাজুট বা বিশাল জটার সঙ্গে এই নামের সম্পর্ক রয়েছে। ‘আমি ধূর্জটী, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর’—এই পংক্তিতে শিবের জটাজুট যেন ঝড়ের এলোমেলো চুলের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে।
অর্থাৎ শিবের জটা এখানে নিছক পৌরাণিক পরিচয় নয়; নজরুল সেটিকে অপ্রতিরোধ্য ঝড়ের প্রতীকে রূপ দিয়েছেন।)
আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি,
আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি।
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ।
আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল,আমি চল-চঞ্চল,
ঠমকি ছমকি পথে যেতে যেতে চকিতে চমকিফিং দিয়া দেই তিন দোল
আমি চপোলা-চপোল হিন্দোল।
আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা,
করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা,
আমি উন্মাদ, আমি ঝঞ্ঝা!
আমি মহামারী, আমি ভীতি এ ধরীত্রির;
আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ণ চির অধীর।
বল বীর-আমি চির-উন্নত মম শির!
(হাম্বীর, ছায়ানট ও হিন্দোল—তিনটিই ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের রাগ। এগুলোকে শুধু ‘সান্ধ্য রাগিণী’ বলা ঠিক নয়, কারণ তিনটি রাগের পরিবেশনের সময় ও সংগীতধর্ম এক নয়। নজরুল এই রাগগুলোর নাম ব্যবহার করে তাঁর ‘আমি’-কে শুধু শক্তিশালী নয়, সুরময়, নৃত্যময় ও চঞ্চল করে তুলেছেন।
বিশেষ করে ‘হিন্দোল’ শব্দটি এখানে অর্থবহ। হিন্দোল শব্দের সঙ্গে দোলনা বা দোলনের ধারণার সম্পর্ক রয়েছে; সংগীতেও হিন্দোল একটি প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ রাগ। ‘চপলা-চপোল হিন্দোল’ বলে নজরুল যেন নিজের বিদ্রোহী সত্তার মধ্যে দোল, গতি ও চঞ্চলতা এনে দিয়েছেন।)
আমি চির-দূরন্ত দুর্মদআমি দূর্দম
মম প্রাণের পেয়ালা হর্দম্ হ্যায় হর্দম্ ভরপুর্ মদ।
আমি হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক জমদগ্নি,
আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি।
আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান,
আমি অবসান, নিশাবসান।
আমি ঈন্দ্রাণী-সুত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য
মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ তূর্য;
আমি কৃষ্ণ-কন্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা বারিধির।
আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।
বল বীর-চির-উন্নত মম শির!
(‘সাগ্নিক’ শব্দটি অগ্নির সঙ্গে সম্পর্কিত। ‘সাগ্নিক জমদগ্নি’তে নজরুল জমদগ্নিকে অগ্নিময়, তেজস্বী ও ক্রোধপ্রবণ শক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
জমদগ্নি ছিলেন প্রাচীন বৈদিক ঋষি এবং পরশুরামের পিতা। তাঁর স্ত্রী ছিলেন রেণুকা। পুরাণীয় কাহিনিতে রেণুকাকে ঘিরে একটি ঘটনার পর জমদগ্নি তাঁর পুত্রদের তাঁকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। কয়েকজন পুত্র সেই আদেশ পালন করতে অস্বীকার করলে জমদগ্নি তাঁদের অভিশাপ দেন। পরশুরাম পিতার আদেশ পালন করেন এবং পরে পিতার কাছ থেকে বর নিয়ে তাঁর মা ও ভাইদের পুনর্জীবিত করেন—এমন কাহিনি বিভিন্ন পুরাণীয় ঐতিহ্যে পাওয়া যায়।
অর্থাৎ ‘জমদগ্নি’ এখানে শুধু একজন ঋষির নাম নয়; তিনি তেজ, ক্রোধ, কঠোরতা ও অগ্নিময় শক্তির প্রতীক।
‘ইন্দ্রাণী-সুত’ বলতে ইন্দ্রাণী বা শচীর পুত্র জয়ন্তকে বোঝানো হয়। নজরুল যখন বলেন ‘হাতে চাঁদ ভালে সূর্য’, তখন তাঁর ‘আমি’কে এক মহাজাগতিক দেবশক্তির রূপ দেওয়া হচ্ছে।
‘এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ তূর্য’—এখানে কৃষ্ণের বাঁশি এবং যুদ্ধের রণতূর্য পাশাপাশি এসেছে। বাঁশি প্রেম, সৌন্দর্য ও সুরের প্রতীক; রণতূর্য যুদ্ধ, সংগ্রাম ও আহ্বানের প্রতীক। অর্থাৎ নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা একই সঙ্গে প্রেমময় এবং যোদ্ধা।
‘কৃষ্ণ-কণ্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া’তে আসলে শিবের নীলকণ্ঠ হওয়ার পৌরাণিক কাহিনির ইঙ্গিত রয়েছে। সমুদ্র মন্থনের সময় হালাহল বিষ বের হলে সৃষ্টিজগত বিপন্ন হয়ে পড়ে। শিব সেই বিষ পান করে নিজের কণ্ঠে ধারণ করেন। বিষের প্রভাবে তাঁর কণ্ঠ নীল হয়ে যায়; তাই তাঁর নাম নীলকণ্ঠ। নজরুল ‘কৃষ্ণ-কণ্ঠ’ শব্দ ব্যবহার করে সেই বিষপানকারী শিবের কাব্যিক রূপ তৈরি করেছেন।
‘ব্যোমকেশ’ শিবের একটি নাম। ‘ব্যোম’ অর্থ আকাশ এবং ‘কেশ’ অর্থ চুল। শিবের জটাজুটের সঙ্গে এই নামের সম্পর্ক রয়েছে।
এর পরের অংশে আসে গঙ্গার পৌরাণিক কাহিনি। রাজা সগরের ষাট হাজার পুত্র কপিল মুনির ক্রোধে ভস্মীভূত হয়েছিল—এমন কাহিনি রামায়ণ ও পুরাণীয় ঐতিহ্যে পাওয়া যায়। তাঁদের মুক্তির জন্য গঙ্গাকে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে আনতে ভগীরথ কঠোর তপস্যা করেন। গঙ্গা পৃথিবীতে নেমে এলে তাঁর প্রবল স্রোতে পৃথিবী বিপন্ন হতে পারে বলে শিব তাঁর জটায় গঙ্গার ধারা ধারণ করেন এবং পরে তাকে পৃথিবীতে প্রবাহিত হতে দেন।
নজরুলের ‘আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর’ পংক্তিতে তাই শিবের সেই গঙ্গাধারক রূপেরই ইঙ্গিত রয়েছে।)
আমি সন্ন্যাসী, সুর সৈনিক,
আমি যুবরাজ, মম রাজবেশ ম্লান গৈরিক।
আমি বেদুইন, আমি চেঙ্গিস, আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কূর্ণিশ
আমি বজ্র, আমি ঈষাণ-বিষানে ওঙ্কার,আমি ইস্রাফিলের শৃঙ্গার মহা-হুঙ্কার,
আমি পিনাক-পাণির ডমরু ত্রিশুল, ধর্মরাজের দন্ড,
আমি চক্র-মহাশঙ্খ,
আমি প্রণব-নাদ প্রচন্ড!আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা, বিশ্বামিত্র-শিষ্য,
আমি দাবানল-দাহ, দহন করিব বিশ্ব।
আমি প্রাণ-খোলা হাসি উল্লাস,
আমি সৃষ্টি-বৈরী মহাত্রাসআমি মহাপ্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহু-গ্রাস!
(‘চেঙ্গিস’ বলতে চেঙ্গিস খানকে বোঝানো হয়েছে। তিনি ছিলেন মঙ্গোল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা এবং ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বিজেতা। নজরুলের কাছে ‘চেঙ্গিস’ অপ্রতিরোধ্য সামরিক শক্তি, দুঃসাহস ও বিজয়ী মানসিকতার প্রতীক। চেঙ্গিস খানের জীবনের কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা এই পংক্তির সরাসরি উৎস—এমন দাবি করার প্রয়োজন নেই।
‘ইস্রাফিল’ ইসলামি ঐতিহ্যের সেই ফেরেশতা, যিনি কিয়ামতের সময় শিঙ্গায় ফুঁ দেবেন বলে বর্ণিত। সেই শিঙ্গার ধ্বনি মহাপ্রলয়ের সূচনার প্রতীক। নজরুলের ‘ইস্রাফিলের শৃঙ্গার মহা-হুঙ্কার’ তাই এমন এক মহাজাগতিক আওয়াজের চিত্র তৈরি করে, যা সমগ্র সৃষ্টিকে কাঁপিয়ে দিতে পারে।
‘পিনাক-পাণি’ শিবের একটি নাম। পিনাক হলো শিবের পৌরাণিক ধনুক। আর ডমরু হলো তাঁর সঙ্গে যুক্ত দ্বিমুখী বাদ্যযন্ত্র; ত্রিশূল তাঁর অন্যতম প্রধান অস্ত্র। অর্থাৎ নজরুল এখানে শিবের ধনুক, বাদ্যযন্ত্র ও অস্ত্র—তিনটি প্রতীককে একসঙ্গে ব্যবহার করেছেন।
‘ধর্মরাজ’ যমের একটি নাম। হিন্দু ঐতিহ্যে তিনি মৃত্যু, বিচার ও পরলোকের সঙ্গে যুক্ত দেবতা। তাঁর হাতে ‘দণ্ড’ কর্তৃত্ব, বিচার ও শাস্তির প্রতীক।
‘দুর্বাসা’ পৌরাণিক সাহিত্যে অত্যন্ত ক্রোধপ্রবণ ঋষি হিসেবে পরিচিত। তাঁর বহু অভিশাপের কাহিনি আছে। ইন্দ্রের ওপর অভিশাপ এবং শকুন্তলার প্রতি তাঁর অভিশাপ বিশেষভাবে পরিচিত। নজরুলের ‘ক্ষ্যাপা দুর্বাসা’ তাই অপ্রতিরোধ্য ক্রোধ ও বিস্ফোরক মেজাজের প্রতীক।
‘বিশ্বামিত্র-শিষ্য’ কথাটিকে আক্ষরিক অর্থে দুর্বাসা বিশ্বামিত্রের শিষ্য ছিলেন—এমন তথ্য হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। নজরুল এখানে নিজের ‘আমি’-কে একদিকে দুর্বাসার ক্রোধ, অন্যদিকে বিশ্বামিত্রের তপস্যা, সাধনা ও আত্মরূপান্তরের শক্তির সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
বিশ্বামিত্র ছিলেন ক্ষত্রিয় রাজা। কঠোর তপস্যার মাধ্যমে তিনি ব্রহ্মর্ষির মর্যাদা লাভ করেন—এমন কাহিনি রামায়ণ ও পুরাণীয় সাহিত্যে প্রচলিত। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতীক হলো অধ্যবসায় ও আত্মরূপান্তর।
শেষে আসে ‘রাহু-গ্রাস’।
হিন্দু পুরাণীয় কাহিনি অনুযায়ী, সমুদ্র মন্থনের পর দেবতাদের জন্য নির্ধারিত অমৃত পান করার সময় স্বর্ভানু নামের এক অসুর দেবতার ছদ্মবেশ নেন। সূর্য ও চন্দ্র তাঁকে চিনে ফেললে বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে তাঁর মস্তক ছিন্ন করেন। কিন্তু অমৃতের স্পর্শ পাওয়ায় তাঁর মাথা অমর হয়ে যায় এবং তা রাহু নামে পরিচিত হয়; তাঁর দেহ কেতু নামে পরিচিত হয়—এমন কাহিনি পুরাণীয় ঐতিহ্যে পাওয়া যায়। ভারতীয় জ্যোতিষ-পুরাণে রাহুর সূর্য ও চন্দ্রকে গ্রাস করার সঙ্গে গ্রহণের সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে।
নজরুল যখন বলেন ‘মহাপ্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহু-গ্রাস’, তখন তিনি এমন এক ভয়ংকর দৃশ্য কল্পনা করছেন যেখানে একসঙ্গে বারোটি সূর্যের মহাজাগতিক আলোও রাহুর গ্রাসে হারিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ বিদ্রোহীর শক্তিকে তিনি মহাপ্রলয়ের পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন।)
আমি কভু প্রশান্ত, -কভু অশান্ত দারুণ স্বেচ্ছাচারী,
আমি অরুণ খুনের তরুণ, আমি বিধির দর্পহারী!
আমি প্রভঞ্জনের উচ্ছাস, আমি বারিধির মহাকল্লোল,আমি উজ্জ্বল,
আমি প্রোজ্জ্বল,আমি উচ্ছল জল-ছল-ছল, চল ঊর্মির হিন্দোল-দোল!-
আমি বন্ধনহারা কুমারীর বেনী, তন্বী নয়নে বহ্নি,
আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দাম, আমি ধন্যি!
আমি উন্মন, মন-উদাসীর,
আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশীর।
আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির গৃহহারা যত পথিকের,
আমি অবমানিতের মরম-বেদনা, বিষ-জ্বালা, প্রিয় লাঞ্ছিত বুকে গতি ফের
আমি অভিমানী চির ক্ষূব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যাথা সূনিবিড়,
চিত চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর থর থর প্রথম পরশ কুমারীর!
আমি গোপন-প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল করে দেখা অনুখন,
আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তাঁর কাঁকণ-চুড়ির কন-কন।
আমি চির শিশু, চির কিশোর,
আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচুলি নিচোর!
আমি উত্তর-বায়ু মলয়-অনিল উদাস পূরবী হাওয়া,
আমি পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীণে গান গাওয়া।
আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াসা, আমি রৌদ্র-রুদ্র রবি
আমি মরু-নির্ঝর ঝর-ঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়াছবি!
আমি তুরীয়ানন্দে ছুটে চলি, এ কি উন্মাদ আমি উন্মাদ!
আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!
আমি উত্থান, আমি পতন,
আমি অচেতন চিতে চেতন,আমি বিশ্বতোরণে বৈজয়ন্তী, মানব-বিজয়-কেতন।
ছুটি ঝড়ের মতন করতালী দিয়া স্বর্গ মর্ত্য-করতলে,
তাজী বোর্রাক্; আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার হিম্মত-হ্রেষা হেঁকে চলে!
আমি বসুধা-বক্ষে আগ্নেয়াদ্রী, বাড়ব বহ্নি, কালানল,
আমি পাতালে মাতাল, অগ্নি-পাথার-কলরোল-কল-কোলাহল!
আমি তড়িতে চড়িয়া, উড়ে চলি জোড় তুড়ি দিয়া দিয়া লম্ফ,
আমি ত্রাস সঞ্চারি ভুবনে সহসা, সঞ্চারি ভূমিকম্প।
ধরি বাসুকির ফণা জাপটি
ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি।
(এই অংশে পৌরাণিক উপমার পাশাপাশি প্রেম, প্রকৃতি, সংগীত ও মানুষের ব্যক্তিগত আবেগও এসে গেছে। অর্থাৎ নজরুল এখানে শুধু ‘ধ্বংসের বিদ্রোহী’ নন; তিনি প্রেমিক, কিশোর, পথিক, বঞ্চিত মানুষ, বিধবার কান্না এবং প্রথম প্রেমের কাঁপুনিও নিজের ‘আমি’-এর মধ্যে ধারণ করছেন।
‘তাজী বোররাক’ বলতে ইসলামি ঐতিহ্যের বোরাককে বোঝানো হয়েছে। মিরাজের যাত্রায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যবহৃত অতিপ্রাকৃত বাহন হিসেবে বোরাকের উল্লেখ ইসলামি ঐতিহ্যে পাওয়া যায়। নজরুলের ‘তাজী বোররাক’ তাঁর বিদ্রোহী সত্তার দ্রুতগতি ও মহাকাশ অতিক্রমের ক্ষমতার প্রতীক।
‘উচ্চৈঃশ্রবা’ সমুদ্র মন্থন থেকে উদ্ভূত ঐশ্বরিক অশ্ব। পুরাণীয় ঐতিহ্যে তাকে অশ্বরাজ বা শ্রেষ্ঠ অশ্ব হিসেবে বর্ণনা করা হয় এবং বিভিন্ন কাহিনিতে ইন্দ্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে। এখানে নজরুল উচ্চৈঃশ্রবার হ্রেষাধ্বনিকে নিজের অপ্রতিরোধ্য গতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
‘বাসুকি’ নাগরাজদের অন্যতম। পুরাণীয় কাহিনিতে তিনি কশ্যপ ও কদ্রুর পুত্র এবং সমুদ্র মন্থনের সময় মন্থন-রজ্জু হিসেবে ব্যবহৃত হন। তাঁর ফণা তাই বিশাল, শক্তিশালী এবং ভয়ংকর সাপশক্তির প্রতীক।
‘জিব্রাইল’ বা জিবরাইল ইসলামী ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান ফেরেশতা এবং আল্লাহর ওহি নবীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। নজরুলের ‘আগুনের পাখা’ তাঁর অতিমানবীয় গতি ও মহাশক্তির কাব্যিক প্রতীক।)
আমি দেবশিশু, আমি চঞ্চল,
আমি ধৃষ্ট, আমি দাঁত দিয়া ছিঁড়ি বিশ্ব-মায়ের অঞ্চল!
আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী,
মহা-সিন্ধু উতলা ঘুম্ঘুম্ঘুম্ চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্বে নিঝ্ঝুমমম বাঁশরীর তানে পাশরি’।
আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী।
আমি রুষে উঠে যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া,
ভয়ে সপ্ত নরক হাবিয়া দোযখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!
আমি বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া!
আমি শ্রাবণ-প্লাবন-বন্যা,
কভু ধরনীরে করি বরণীয়া, কভু বিপুল ধ্বংস ধন্যা-
আমি ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু-বক্ষ হইতে যুগল কন্যা!
আমি অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি,
আমি ধূমকেতু জ্বালা, বিষধর কাল-ফণী!
আমি ছিন্নমস্তা চন্ডী, আমি রণদা সর্বনাশী,
আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!
(‘অর্ফিয়াস’ গ্রিক পুরাণের এক কিংবদন্তি কবি ও সংগীতজ্ঞ। তাঁর সংগীতের শক্তি এতটাই প্রবল বলে কাহিনিতে বর্ণিত যে মানুষ, পশু, বৃক্ষ, এমনকি পাথরও তাঁর সুরে আকৃষ্ট হতো। নজরুল যখন বলেন ‘আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী’, তখন তাঁর বিদ্রোহী সত্তার মধ্যে এমন এক সংগীতশক্তি কল্পনা করা হচ্ছে, যার প্রভাবে কঠিন ও স্থির পৃথিবীও যেন নড়ে ওঠে।
‘শ্যাম’ এখানে শ্রীকৃষ্ণের নাম। কৃষ্ণের বাঁশি বৈষ্ণব ঐতিহ্যে প্রেম, সৌন্দর্য ও মোহনের প্রতীক। অর্ফিয়াসের সুর এবং কৃষ্ণের বাঁশি—দুই ভিন্ন সভ্যতার দুই সংগীত-প্রতীককে পাশাপাশি এনে নজরুল তাঁর ‘আমি’-কে বিশ্বজনীন করে তুলেছেন।
‘আমি ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু-বক্ষ হইতে যুগল কন্যা’—এই পংক্তিটি সরাসরি কোনো একক পৌরাণিক ঘটনার বর্ণনা নয়। ‘যুগল কন্যা’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। কিছু ব্যাখ্যায় লক্ষ্মী ও সরস্বতীর প্রতীকী ইঙ্গিত দেখা হয়। তবে এটিকে কৌস্তুভমণির সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। কৌস্তুভ হলো সমুদ্র মন্থন থেকে উদ্ভূত এক ঐশ্বরিক রত্ন, যা বিষ্ণুর বক্ষে শোভা পায়।
‘ছিন্নমস্তা’ দশ মহাবিদ্যার একটি ভয়ংকর দেবীরূপ। প্রচলিত চিত্রণে তিনি নিজের মস্তক নিজেই ছিন্ন করে নিজের রক্তধারা পান করছেন—এই আত্মবলিদান ও ভয়ংকর শক্তির প্রতীকী রূপে তাঁকে দেখানো হয়।
‘চণ্ডী’ দেবী দুর্গার এক উগ্র ও যোদ্ধারূপ, যিনি অসুরবধের সঙ্গে যুক্ত। ‘রণদা’ শব্দটি এখানে যুদ্ধপ্রবণ, ভয়ংকর ও সর্বনাশী নারীত্বের চিত্রকল্পকে আরও তীব্র করেছে।)
আমি মৃন্ময়, আমি চিন্ময়,আমি অজর অমর অক্ষয়, আমি অব্যয়!
আমি মানব দানব দেবতার ভয়,
বিশ্বের আমি চির-দুর্জয়,জগদীশ্বর-ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য,
আমি তাথিয়া তাথিয়া মাথিয়া ফিরি স্বর্গ-পাতাল মর্ত্য!
আমি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!!
আমি সহসা আমারে চিনেছি, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!!
আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার,
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!
আমি হল বলরাম স্কন্ধে,
আমি উপাড়ি' ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে।
মহা- বিদ্রোহী রণ-ক্লান্তআমি সেই দিন হব শান্ত,যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না -
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্তআমি আমি সেই দিন হব শান্ত!
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান-বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন
আমি স্রষ্টা-সুদন, শোক-তাপ-হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান-বুকে এঁকে দিব পদ-চিহ্ন
আমি খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন
আমি চির-বিদ্রোহী বীর--
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির !
(পরশুরাম ছিলেন জমদগ্নি ও রেণুকার পুত্র। তাঁর প্রধান অস্ত্র ছিল কুঠার, এবং সেই কারণে তাঁর নামের সঙ্গে ‘পরশু’ বা কুঠারের সম্পর্ক রয়েছে। পুরাণীয় কাহিনি অনুযায়ী, কার্তবীর্য অর্জুনের সঙ্গে সংঘর্ষের পর পরশুরামের পিতা জমদগ্নি নিহত হন। পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে পরশুরাম ক্ষত্রিয়দের বিরুদ্ধে ভয়ংকর অভিযান চালান এবং একুশবার পৃথিবীকে ক্ষত্রিয়শূন্য করেছিলেন—এমন কাহিনি পুরাণে পাওয়া যায়।
নজরুল যখন বলেন ‘আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার, নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব’, তখন তিনি পরশুরামের সেই পৌরাণিক ধ্বংসশক্তিকে নিজের বিদ্রোহী সত্তার সঙ্গে যুক্ত করছেন। কিন্তু পরের পংক্তিতেই কবিতাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়—‘আনিব শান্তি শান্ত উদার’। অর্থাৎ ধ্বংস এখানে উদ্দেশ্য নয়; অন্যায় ও অত্যাচার দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠাই লক্ষ্য।
এরপর আসে বলরাম।
বলরাম ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের বড় ভাই। তাঁর প্রধান অস্ত্র ছিল হল বা লাঙ্গল; তাই তাঁর অন্যতম নাম ‘হলধর’। তিনি গদাযুদ্ধেও অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তিনি নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেন। ভীম ও দুর্যোধনের গদাযুদ্ধের সময় ভীম দুর্যোধনের উরুতে আঘাত করলে বলরাম ক্ষুব্ধ হন এবং ভীমকে শাস্তি দিতে উদ্যত হন; পরে কৃষ্ণ তাঁকে নিবৃত্ত করেন।
‘আমি হল বলরাম স্কন্ধে’—এখানে নজরুল বলরামের লাঙ্গলকে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। লাঙ্গল সাধারণত কৃষি ও সৃষ্টির প্রতীক; কিন্তু বলরামের হাতে সেটিই হয়ে ওঠে শক্তিশালী অস্ত্র। ফলে এই পংক্তিতে ধ্বংস ও সৃষ্টির দ্বৈত অর্থও পাওয়া যায়।
তারপর আসে কবিতার অন্যতম গভীর পৌরাণিক ইঙ্গিত—ভৃগু।
ভৃগু প্রাচীন বৈদিক ঋষিদের অন্যতম। একটি বিখ্যাত পৌরাণিক কাহিনিতে ব্রহ্মা, শিব ও বিষ্ণুর মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ তা পরীক্ষা করার জন্য ভৃগুকে পাঠানো হয়। ভৃগু ব্রহ্মা ও শিবের সঙ্গে এমন আচরণ করেন যাতে তাঁদের ক্রোধ প্রকাশ পায়। পরে বিষ্ণুর কাছে গিয়ে দেখেন তিনি শয্যাশায়ী। ভৃগু তাঁকে জাগাতে তাঁর বুকে পদাঘাত করেন।
কিন্তু বিষ্ণু ক্রুদ্ধ হন না। বরং তিনি ভৃগুর পায়ের খোঁজ নেন। এই কাহিনির মাধ্যমে বিষ্ণুর ক্ষমাশীলতা ও মহত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
নজরুল এই কাহিনিকে সম্পূর্ণ নতুন অর্থ দিয়েছেন:
‘আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান-বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন।’
এখানে ভৃগুর পদাঘাতকে শুধু ধর্মীয় অবমাননা হিসেবে দেখলে পংক্তিটির গভীরতা বোঝা যাবে না। নজরুল ভৃগুর সেই দুঃসাহসকে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন তোলার প্রতীকে পরিণত করেছেন। এমনকি ‘ভগবান’-এর বুকেও পদচিহ্ন এঁকে দেওয়ার সাহস তাঁর ‘বিদ্রোহী’ সত্তার অংশ।
আর তাই কবিতার শেষ ঘোষণা:
‘আমি চির-বিদ্রোহী বীর—
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা
চির-উন্নত শির!’
শুরুতে যে মাথা হিমালয়কে নত করেছিল, কবিতার শেষে সেই মাথাই সমগ্র বিশ্বকে ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়।
‘বিদ্রোহী’র এই দীর্ঘ পৌরাণিক যাত্রার সবচেয়ে বড় বিস্ময় এখানেই—নজরুল রুদ্রের ধ্বংসশক্তি, ভীমের বল, কৃষ্ণের বাঁশি, শিবের বিষধারণ, পরশুরামের কুঠার, বলরামের লাঙ্গল, ইস্রাফিলের মহাধ্বনি, জিব্রাইলের পাখা, অর্ফিয়াসের সুর এবং ভৃগুর দুঃসাহস—সবকিছুকে একত্র করে শেষ পর্যন্ত একটি মাত্র শব্দে পরিণত করেছেন:
আমি।
Comments
Post a Comment