বিপুল বিক্রমে ডাকসুতে কায়দে আযমের ছবি ছেঁড়া হয়েছে। তাও আবার মোদির ডান-পক্ষের শাবকদের উস্কানি আর সমর্থনে। কারণ জিন্নাহ বাংলা ভাষার শত্রু। জিন্নাহ বাঙালির শত্রু। মুসলমান জাতির শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলমানদের স্বাধীন আবাসভূমির প্রতিষ্ঠাতার ছবি থাকতে পারবেনা। এব্যাপারে মোদির ডান পক্ষ, বাম পক্ষ, মধ্যম পক্ষের সকল শাবকেরা ঐক্যবদ্ধ।
খুব বেশি কিছু না। শুধুমাত্র এই তিনটা ঐতিহাসিক প্রমাণ দেখুন।
০১.
আযাদীর মাত্র মাস দুয়েক আগেও কায়দে আযম বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগের বিরুদ্ধে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলছেন :
"... বাংলা ও পাঞ্জাবকে ভাগ করার যে প্রশ্নটি এখন তোলা হচ্ছে, তা কোনো সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে করা হয়নি; বরং বিদ্বেষ ও তিক্ততা থেকে উদ্ভূত এক অশুভ পদক্ষেপ হিসেবেই এটি করা হচ্ছে। তারা মনে করছে যে ভারত ভাগ হতে চলেছে, তাই এই বিভাজনের প্রেক্ষাপটে — প্রথমত, ব্রিটিশ সরকার ও ভাইসরয়ের পথে আরও জটিলতা সৃষ্টি করা এবং দ্বিতীয়ত, মুসলমানদের মনোবল ভেঙে দেওয়া — হলো তাদের মূল লক্ষ্য। মুসলমানদের বারবার এটা বোঝানো ও জোর দিয়ে বলা হচ্ছে যে, তারা কেবল একটি খণ্ডিত, বিকৃত ও জরাজীর্ণ (কীটদষ্ট) পাকিস্তানই পাবে। এই দাবির পেছনে কোনো যৌক্তিক বা নীতিগত ভিত্তি নেই; এর একমাত্র কারণ হলো পাঞ্জাব ও বাংলার হিন্দু সংখ্যালঘুরা এই প্রদেশগুলোকে এবং এই প্রদেশগুলোতে বসবাসকারী তাদের নিজেদের জনগোষ্ঠীকেও দ্বিখণ্ডিত করতে চায়। আমি আগেই বলেছি, হিন্দুদের নিজস্ব আবাসভূমি হিসেবে ছয়টি বিশাল প্রদেশ রয়েছে। পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত প্রদেশগুলোর সংখ্যালঘুদের একটি অংশ ব্রিটিশ সরকারের কাছে এমন মনোভাব পোষণ করছে বলেই যে সরকারকে তা মেনে নিতে হবে — এমনটা হওয়া উচিত নয়। কারণ, যৌক্তিক বিচারে এর ফলে অন্য সব প্রদেশকেও একইভাবে ভাগ করতে হবে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক হবে; কারণ এই পথে অগ্রসর হলে বিভিন্ন প্রদেশ ভেঙে পড়ার উপক্রম হবে এবং বর্তমানে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, ভবিষ্যতে তার চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। যদি এমন কোনো প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়, তবে তা ঐসব প্রদেশের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মূলে আঘাত হানবে — যে কাঠামো প্রায় এক শতাব্দী ধরে গড়ে উঠেছে এবং বর্তমান সংবিধানের অধীনে স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ হিসেবে বিকশিত হয়েছে॥"
তথ্যসূত্র : Jinnah, Muhammad Ali. “Move to Partition Punjab and Bengal.” New Delhi, 4 May 1947/ British Foreign Office file FO 371/63533॥ The National Archives, UK.
০২.
অত:পর দেখুন, জিন্নাহর সেই রাষ্ট্রভাষা বিরোধী কুখ্যাত উক্তির বাইশ বছর পরে এসেও তথাকথিত হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিব বাঙালির দুশমন বাঙলা ভাষার দুশমনের মাজারে গিয়ে ফাতেহা পাঠ করছেন, মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছেন যারা আমাদের মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চাইছিল তাদেরই নাপাক ভূমিতে।
সূত্র: দ্য ডন — আগস্ট ৯, ১৯৬৯ইং
০৩.
এরপর দেখুন, তথাকথিত জাতির পিতা শেখ মুজিব আযাদীর বাইশ বছর পরে এবং এবং এবং বাংলা ভাষার দুশমন বাঙালির দুশমন যার ছবিকে পর্যন্ত আজ সহ্য করতে নারাজ মোদির সন্তানেরা সেই জিন্নাহকেই সম্বোধন করছে কায়দে আজম বলে এবং নিশ্চিত করছেন —
"... আবার তিনি (সোহরাওয়ার্দী) একমাত্র ব্যক্তি যিনি খণ্ডিত পাকিস্তানে খণ্ডিত বাংলার কুফল উপলব্ধি করিতে পারিয়াছিলেন। তাহার ফলে উদ্ভব হইয়াছিল বৃহত্তর বাংলার ‘সোহরাওয়ার্দী-বসু চুক্তি' (জনাব সোহরাওয়ার্দী ও মিঃ শরৎচন্দ্র বসুর নামানুসারে)। এই পরিকল্পনার প্রতি কায়েদে আজমেরও আশীর্বাদ ছিল, কিন্তু মি: বল্লভ ভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে পরিচালিত চরমপন্থী কংগ্রেস মহল এবং মি: শ্যামা প্রসাদ মুখার্জীর ন্যায় সাম্প্রদায়িকতাবাদিগণ এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করিতে দেয় নাই॥"
তথ্যসূত্র: নেতাকে যেমন দেখিয়াছি / শেখ মুজিবুর রহমান ॥ [দৈনিক ইত্তেফাক (বিশেষ সোহরাওয়ার্দী সংখ্যা) — ০৫ ডিসেম্বর, ১৯৬৯ইং । পৃ: ১৪৩-১৪৬]
Comments
Post a Comment