ইংরেজি না জানায়, ঝালকাঠিতে শহীদ হন ১৯ জন মুসলমান।
আজ থেকে ১০০ বছর পূর্বে ১৯২৬ সালে শুধুমাত্র ইংরেজি না জানার কারণে, হিন্দুদের কুটচালে ব্রিটিশদের গুলিতে শাহাদাত বরণ করেন ১৯ জন মুসলমান।
১৯২৬ সাল। বরিশালের ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার কুলকাঠি গ্রামে মুসলমানদের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের টানটান উত্তেজনার মধ্যে কুলকাঠিতে মসজিদ নির্মাণকে স্বাভাবিকভাবেই সহ্য করতে পারেনি স্থানীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। এভাবে দিন গড়িয়ে বছর পেরুতেই ১৯২৭ সালে হিন্দু-মুসলিম উত্তেজনা শুরু হয়। কুলকাঠির পাশ্ববর্তী গ্রাম পোনাবালিয়ার শিববাড়িতে হিন্দুদের শিবচতুর্দশী হতো।
(হিন্দু সম্প্রদায়ের ৫২ টি আন্তর্জাতিক তীর্থস্থানের তৃতীয়টি সেখানে। এই শিববাড়িতে শিবচতুর্দশী মেলা হয়। এখনকার সময়ে দুই কি'বা তিনদিনে মেলা শেষ হলেও তখন একপক্ষ থেকে দীর্ঘ একমাস ব্যাপী এই মেলা চলত।)
কুলকাঠি থেকে পোনাবালিয়ার শিববাড়িতে যেতে হতো নবনির্মিত মসজিদ সংলগ্ন রাস্তা পার হয়ে। মেলার শুরু থেকেই হিন্দুরা ঢাকঢোল পিটিয়ে, কির্তন করতে করতে মসজিদ সংলগ্ন রাস্তা দিয়ে শিবচতুর্দশীতে অংশগ্রহণ করতেন। যার ফলে জোহরের ওয়াক্তে মুসল্লীদের নামাজে বিঘ্ন সৃষ্টি ও মসজিদের পবিত্রতা নষ্ট হতো৷ এমতাবস্থায় সমস্যার প্রতিকার করার জন্য মুসল্লীদের সমন্বয়ে মসজিদের ইমাম মৌলভী সৈয়দ উদ্দিনের নেতৃত্বে, মুসলমানদের একটি দল হিন্দু নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাৎ করে শোভাযাত্রাকারীদেরকে মসজিদের পবিত্রতায় বিঘ্ন না ঘটানোর অনুরোধ করেন। কিন্তু তারা কয়েক দফা আলোচনা করেও সুফল লাভে ব্যর্থ হন। হিন্দুরা যথারীতি নামাজের সময় ঢাকঢোল পিটিয়ে মসজিদ পার হওয়া জারি রাখলো।
এমতাবস্থায় ১৯২৭ সালের মার্চের শুরুর দিকে মুসলমানরা সিদ্ধান্ত নেন জোহরের ওয়াক্তে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে কোনোমতেই মসজিদের পবিত্রতা হনন করতে দিবেন না। অপরদিকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও ঢাক-ঢোল পিটিয়ে মসজিদ অতিক্রম করার জন্য প্রস্তুতি নেয়। যাকে বলে গায়ে পড়ে ঝগড়া। ফলে, ৭ মার্চ সকাল থেকেই উভয় শিবিরে উত্তপ্ত অবস্থা বিরাজ করতে থাকে। বেলা ১০:০০ টার দিকে মুখোমুখি অবস্থানে দাড়ায় দুই সম্প্রদায়। তৎকালীন বরিশালের বিখ্যাত হিন্দু নেতা সত্যাগ্রহ আন্দোলনের কর্মী সতীন্দ্রনাথ সেন (পরবর্তীতে বরিশাল কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট) ১৯২০ সালে গড়ে তোলা অসহযোগ আন্দোলনের সময়কার যুববাহিনীর একদল স্বেচ্ছাসেবক (!) নিয়ে শিববাড়ি-কুলকাঠি এলাকায় মুসলমানদের বিপক্ষে আক্রমনাত্মক অবস্থান নেন। তিনি হিন্দুদের আরো উচ্চস্বরে কীর্তন করতে নির্দেশ দেন।
এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির আশঙ্কায় ঘটনাস্থলে গুর্খা বাহিনী নিয়ে হাজির হন তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ই.এন. ব্ল্যান্ডি, পুলিশ সুপার মিস্টার টেইলরসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।
সেখানে উপস্থিত থাকা মুসলমানদের কেউই ইংরেজি জানতেন না। ঘটনার একপর্যায়ে নিরক্ষর মুসলমানগণ ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটকে মসজিদের পবিত্রতা রক্ষার্থে হাত দিয়ে গলা কাটার ইঙ্গিত সূচক বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, বাদ্য-যন্ত্র বাজিয়ে মসজিদ অতিক্রম করার চেয়ে আমাদের প্রাণ বিসর্জন শ্রেয়। কিন্তু, ইংরেজি শিক্ষিত হিন্দুরা ম্যাজিস্ট্রেটকে ইংরেজিতে বলে বোঝান, তারা আমাদের গলা কাটার ইঙ্গিত করছে। ঘটনার চরম উন্মাদনায় ফেটে পড়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি এবং মসজিদের ইমাম মৌলভী সৈয়দ উদ্দিনকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেন। এতে করে মুসলমানদের মধ্যে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। কোনো মতেই মসজিদ সংলগ্ন এলাকা ছেড়ে না যেয়ে সেখানেই অবস্থান নেন সাধারণ মুসল্লীরা।
পরিস্থিতি যখন এই পর্যায়ে এসে দাঁড়ায়, তখন ম্যাজিস্ট্রেট ব্ল্যান্ডি মুসলমানদের উপর গুলি বর্ষণ করার নির্দেশ প্রদান করেন। এ ঘটনায় ১৯ জন মর্দে মুজাহিদ বাবর উল্লাহ হাওলাদার, ইয়াসিন আকন, সেরাজ উদ্দিন, সুন্দর খান, ছবদার খান, আফেল গাজী, আতামুদ্দিন হাওলাদার, নঈম উদ্দিন হাওলাদার, মোসলেম উদ্দিন, হাসান উল্লাহ হাওলাদার, মোহন মোল্লা, বলু খান, ফরমান উল্লাহ, আবুল হোসেন হাওলাদার, রিয়াজ উদ্দিন, রহমালি হাওলাদার, জাহের তালুকদার, মফেজ হাওলাদার, জহির উদ্দিন হাওলাদার জোহরের ওয়াক্তের কিছু সময় পূর্বে গুর্খা সৈনিকদের গুলিতে শহীদ হন। এছাড়াও মসজিদে অবস্থান করা ৫০ জন মুসল্লী আহত হন৷
এখনকার সময়ে এই ঘটনা অবিশ্বাস্য মনে হলেও বাস্তবে সেসময় এমন পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছিলো। শুধুমাত্র মুসলমানদের ইংরেজি বলতে না পারার দরুণ হিন্দুরা প্রশাসনের অবস্থান নিজেদের পক্ষে করে নেয়। ফলস্বরূপ ১৯ জন মুসলমান শহীদ হন।
কুলকাঠির এই ঘটনা ইতিহাসে ‘ কুলকাঠি হত্যাকান্ড অথবা পোনাবালিয়া হত্যাকান্ড’ নামে পরিচিতি পায়। ঘটনার পরপরই তৎকালীন বৃটিশ-ভারতীয় পত্রিকাগুলোতে ঘটনার নৃশংসতা ফলাওভাবে প্রচারিত হয়। ১৯ শহীদের শহীদি জনপদের এই স্মৃতি আজও বয়ে বেড়াচ্ছে কুলকাঠি শহীদিয়া ইউনিয়ন একাডেমি, শহীদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কুলকাঠি শহীদিয়া দাখিল মাদরাসা। রক্তের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নির্মল শুভ্র মসজিদটিও।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী শহীদ, শরীফ ওসমান বিন হাদি ছিলেন সেই ঐতিহাসিক কুলকাঠি গ্রামেরই সন্তান।ছোটবেলা থেকেই তার বাবার কাছ থেকে শহীদি পাঠ এবং ইংরেজি শিক্ষার প্রবল অনুপ্রেরণা নিয়ে ঢাকায় পড়তে আসেন। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির শিক্ষকও হন।
বিঃদ্রঃ ছবিটি অন্য ঘটনার। লেখার সাথে সামঞ্জস্য থাকায় ব্যবহার করা হয়েছে।
লেখা: ইংরেজি না জানায়, শহীদ ১৯ মুসলমান।
মোহাম্মদ আলী আকবর
শিক্ষার্থী, নোয়াখালী সরকারি কলেজ।
Comments
Post a Comment